এক সময় যে হাম বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছিল, নীতি নির্ধারণী ব্যর্থতা আর রাজনৈতিক পালাবদলের ডামাডোলে সেই মরণব্যাধিই এখন দেশের শিশুদের জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও তৃণমূল পর্যায়ে মাইকিং করে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার যে সফল ধারা তৈরি হয়েছিল, গত ১৮ মাসে তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিলের হঠকারী সিদ্ধান্তে স্থবির হয়ে পড়ে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া।
এর সরাসরি ফল হিসেবে বর্তমানে দেশে হাম-রুবেলা, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া-ধনুষ্টংকার এবং হেপাটাইটিস-বি এই ছয় ধরনের জীবনরক্ষাকারী টিকার মজুদ এখন শূন্য।
জন্মের পর ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর যে ৯টি মৌলিক টিকা পাওয়ার কথা, তার মধ্যে ৬টিই এখন অমিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, ইউনিসেফের বদলে ওপেন টেন্ডারে টিকা কেনার অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে তা আবার পরিবর্তনের গোলকধাঁধায় পড়ে দেশ আজ ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটে।
গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারপারসন ড. নিজাম উদ্দিনের মতে, গত এক বছর নিয়মিত টিকাদান বাধাগ্রস্ত হওয়ায় হাম এখন দেশজুড়ে মহামারির আকার নিচ্ছে।
অন্যদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের ভূমিকাও এখন প্রশ্নের মুখে। এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও টিকা সংকট নিরসনে বা ‘মিজেলস ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ শুরু করতে তাদের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা চোখে পড়ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র বানিয়ে শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার, আর বর্তমান সরকার সেই সংকট নিরসনে বজায় রেখেছে রহস্যজনক নীরবতা।
দুর্নীতির ইতিহাস আর অদক্ষতার বৃত্তে বন্দি রাজনৈতিক দলগুলোর এই টানাপোড়েনের বলি হচ্ছে দেশের অগুনতি শিশু, যারা নিজের অধিকারের কথাটুকু বলার ক্ষমতাও রাখে না। টিকা নেই, অথচ প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল এই ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন উঠেছে, শিশুদের জীবনের চেয়ে কি রাজনৈতিক ক্ষমতা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই বড়?
