২০২৫ সালে বাংলাদেশের শিশুদের নিয়মিত টিকাদান হঠাৎ করে বড়ভাবে কমে যায় – গড় কভারেজ নেমে আসে প্রায় ৬০% এর আশেপাশে। এই ঘটনাটাকেই এখন অনেক বিশেষজ্ঞ “vaccination failure” বলছেন।
এর সরাসরি ফল আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি -হাম (measles) রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। কিন্তু বিষয়টা শুধু হামেই সীমাবদ্ধ না; এই এক বছরের টিকার ঘাটতি আগামী কয়েক বছর ধরে একের পর এক রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালে বিভিন্ন টিকার কভারেজ আনুমানিক এমন ছিল: BCG প্রায় ৬০%, পেন্টাভ্যালেন্ট-১ (Penta-1) প্রায় ৫৮–৬০%, পেন্টাভ্যালেন্ট-৩ (Penta-3) প্রায় ৫৫–৫৮%, হাম/রুবেলা প্রথম ডোজ (MR-1) প্রায় ৫৬–৫৭%, এবং দ্বিতীয় ডোজ (MR-2) প্রায় ৫৭% এর কাছাকাছি।
অথচ জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড অনুযায়ী কমপক্ষে ৯০% কভারেজ থাকা জরুরি, আর হাম প্রতিরোধের জন্য এই হার ৯৫% বা তার বেশি হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিরাপদ সীমার অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল টিকাদান।
সহজভাবে বললে, টিকা শরীরকে আগে থেকেই “শত্রুকে চিনে রাখতে” শেখায়। যখন অনেক শিশু টিকা পায় না, তখন একটা বড় অংশ “unprotected” থেকে যায় এটাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে susceptible population (অর্থাৎ রোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জমে থাকা)।
এই জমে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষই ভবিষ্যতের outbreak তৈরি করে।
হাম কেন আগে শুরু হলো, সেটা বুঝতে হলে একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা জানতে হবে—R₀ (R naught)।
এটা বোঝায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে কয়জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হাম রোগের R₀ প্রায় ১২–১৮, অর্থাৎ খুবই সংক্রামক। তাই হাম ঠেকাতে লাগে প্রায় ৯৫% মানুষের টিকা—এটাকে বলে herd immunity (সমষ্টিগত সুরক্ষা)। ২০২৫ সালে যখন কভারেজ ৬০% এ নেমে যায়, তখন এই সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, এবং খুব দ্রুত outbreak শুরু হয়—যেটা এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন—হামের পর আর কোন কোন রোগ outbreak হতে পারে?
সবচেয়ে আগে ঝুঁকিতে থাকে ডিফথেরিয়া (Diphtheria) এবং পারটুসিস বা হুপিং কাশি (Whooping cough)। এই দুই রোগের টিকা থাকে পেন্টাভ্যালেন্ট (Penta) ভ্যাকসিনে। এগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা মাঝারি থেকে বেশি (R₀ ৫–১৭ এর মধ্যে), এবং immunity সময়ের সাথে কমে যায়। তাই ২০২৫ সালে যারা টিকা মিস করেছে, তারা যদি দ্রুত catch-up (missed dose পূরণ) না পায়, তাহলে ৬ মাস থেকে ১৮ মাসের মধ্যে এসব রোগের outbreak দেখা দিতে পারে।
এরপর আসে নিউমোনিয়া (বিশেষ করে pneumococcal infection)। এটা খুব দ্রুত explosive outbreak না করলেও ধীরে ধীরে হাসপাতালে ভর্তি, গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত ১–২ বছরের মধ্যে এর প্রভাব দেখা যায়।
পোলিওর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একটু আলাদা। এটা খুব দ্রুত outbreak করে না, কারণ আগের অনেক বছরের টিকাদান এখনো কিছু সুরক্ষা দিয়ে রাখে। কিন্তু যদি কয়েক বছর ধরে coverage কম থাকে, তাহলে ২–৫ বছরের মধ্যে silent transmission (চুপচাপ ছড়ানো) শুরু হয়ে আবার বড় আকার নিতে পারে।
হেপাটাইটিস বি-এর মতো রোগ আরও ধীরে প্রভাব দেখায়—৫–১০ বছর পর chronic liver disease বা cancer হিসেবে সামনে আসে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালের টিকার এই ব্যর্থতার কারণে একটি সম্ভাব্য টাইমলাইন দাঁড়ায় এমন:
হাম → ইতিমধ্যেই শুরু (০–৬ মাস)
ডিফথেরিয়া/পারটুসিস → ৬–১৮ মাস
নিউমোনিয়া → ১–২ বছর
পোলিও → ২–৫ বছর
হেপাটাইটিস বি → ৫–১০ বছর
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি জুন ২০২৬ থেকে আবার ৯০% বা তার বেশি টিকাদান শুরু হয়, তাহলে কি সব ঠিক হয়ে যাবে?
উত্তরটা একটু জটিল। নতুন করে টিকা দেওয়া শুরু করলে ভবিষ্যতের শিশুদের সুরক্ষা পাওয়া শুরু হবে, কিন্তু ২০২৫ সালে যারা টিকা পায়নি, তারা তো এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। এই জমে থাকা susceptible population সহজে দূর হয় না। তাই শুধু routine vaccination বাড়ালেই হবে না, দরকার catch-up campaign—যেখানে মিস করা শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দিতে হবে।
যদি শুধু জুন থেকে নিয়মিত টিকা দেওয়া শুরু হয় কিন্তু catch-up না হয়, তাহলে:
হাম কিছুদিন চলতেই থাকবে
ডিফথেরিয়া ও পারটুসিসের ঝুঁকি থাকবে
নিউমোনিয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়বে
কিন্তু যদি একই সাথে mass campaign করে মিস করা শিশুদের টিকা দেওয়া হয়, তাহলে এই সম্ভাব্য outbreak গুলো অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।
মেডিকেল সায়েন্সে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে—“Measles is a warning signal.” অর্থাৎ হাম outbreak মানে পুরো immunization system-এ সমস্যা হয়েছে। এই সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব না দিলে সামনে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আসতে পারে।
সুতরাং, ২০২৫ সালের টিকাদানের ব্যর্থতা শুধু একটি বছরের সমস্যা না—এটা আগামী কয়েক বছরের জনস্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এখন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষতি কমানো সম্ভব, না হলে একের পর এক প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবার ফিরে আসতে পারে।
ইউনূস সরকার একটা দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিভাবে হুমকি তে ফেলে দিলো তা অকল্পনীয়। অনেক বছর ধরে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশ কে ভ্যাকসিন হিরো হিসেবে তুলে এনেছে, ইউনূসীয় শাসনের ব্যর্থতায় তা আজকে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিএনপি সরকারের এই EPI failure নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নাই, থাকলে এখনেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসে একটা সমাধানের পথ বের করতো। Catch-up campaign যদি না করে তাহলে এটা failure হিসেবে থাকবে।
