নিজস্ব প্রতিনিধি :
১০ মাসের শিশু মাহাজবিকে বাঁচানো গেল না। তিন দিন আইসিইউতে যমে-মানুষে লড়াই করার পর হামে মৃত্যু হয় তার। নাড়িছেঁড়া ধনের নিথর শরীরে মাথা ঠেকিয়ে মা শিউলি আক্তারের সেই আর্তনাদ আজ মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। মাহাজবি তো কেবল একটি নাম, হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৩৪৩ জন নিষ্পাপ শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যু কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং শিশুদের ওপর একের পর এক করা প্রশাসনিক ‘অন্যায়’ ও চরম অবহেলার ফল।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, হাম প্রতিরোধে কেবল টিকাই নয়, পুষ্টির বড় ভূমিকা থাকলেও সেখানেও শিশুদের বঞ্চিত করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, “মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রচার নেই, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল, এমনকি কৃমিনাশক বড়িও ঠিকমতো খাওয়ানো হয়নি। এসবই অপুষ্টি বাড়িয়েছে এবং শিশুদের হামের সামনে অরক্ষিত করে তুলেছে।”
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ শতাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের কম। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ শিশুই কোনো টিকা পায়নি। টিকার আওতা ৯৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রতি বছর কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ২০২০ সালের পর জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন করার কথা থাকলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা বারবার পেছানো হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে এখনকার শিশুদের।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে অপরিহার্য ভিটামিন এ-এর ঘাটতিও এখন প্রকট। প্রতি বছর দুবার ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে তা করা হয়নি। একই পরিস্থিতি কৃমিনাশক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও। অন্যদিকে, ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী যেখানে ৬৫ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ পেত, বর্তমানে তা কমে ৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি এবং টিকার এই দ্বিমুখী অভাবই আজকের এই মহামারি সদৃশ পরিস্থিতির মূল কারণ।
