নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজশাহী নগরীর টিবিপুকুর এলাকায় নির্মিত ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি যেন এক মরীচিকা। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অত্যাধুনিক ভবনটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় পড়ে থেকে এখন রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। একদিকে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। অন্যদিকে আইসিইউ সংকটে ধুঁকতে থাকা শিশুরা চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে হাসপাতালটি স্থানীয় প্রভাবশালী ও সমন্বয়কদের ছায়াতলে এক অঘোষিত দখলে রয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০২৩ সালে জুনে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে এই হাসপাতালটি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। স্থানীয় সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর হাসপাতালের ভবনটি দখলের চেষ্টা করেছিল জামায়াত বিএনপি এনসিপি সমর্থকরা। যদিও ঠিকাদারদের লোকজনের বাধায় সেটি পুরোপুরি সফল না হলেও, বর্তমানে স্থাপনাটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ এমন পর্যায়ে গেছে যে সেখানে সরকারি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে হাসপাতালটি এখন জনসেবার বদলে নিছক পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ থাকা ভবনটির রং চটে যাচ্ছে। ভবনের প্রতিটি কক্ষে পড়ে থাকা অত্যাধুনিক এসি, বিশাল ফ্রিজ এবং জেনারেটরগুলো অব্যবহারের কারণে অকেজো হওয়ার পথে। ৩৫ কোটি টাকার এই সরকারি সম্পদ এখন ধুলোবালি ও মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে, যা দেখার যেন কেউ নেই।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে শিশু রোগীর প্রচণ্ড চাপ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, রামেকের আইসিইউ সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে যে ৪০ শয্যার আইসিইউ চলছে, তা সরকার অনুমোদিত নয়। হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এটি চলছে, যেখানে সরকার কাউকে নিয়োগ দেয়নি।’
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আইসিইউর চাহিদা ব্যাপক। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চমূল্যের চিকিৎসা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। রামেকের বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক রোগীর সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, অথচ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন শিশু হাসপাতালটি চালু হলে এই সংকট সহজেই সমাধান হতো।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন এস আই এম রাজিউল করিম জানান, হাসপাতালটি চালু হলে রামেক হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমত এবং শিশুরা উন্নত সেবা পেত। কিন্তু কেন এটি এখনো চালু করা যাচ্ছে না, তার কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব মিলছে না।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনের অবহেলা আর স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রাজশাহী অঞ্চলের শিশুরা আজ মৌলিক চিকিৎসা অধিকার থেকে বঞ্চিত। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্মিত এই ভবনটি কেন নতুন সরকারের অধীনেও চালু হলো না? কেন বিশেষ গোষ্ঠী বা সমন্বয়কদের প্রভাবের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে শিশুদের জীবন?
দ্রুত এই হাসপাতালটি দখলমুক্ত করে চিকিৎসাসেবা চালুর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
