নিজস্ব প্রতিনিধি
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে দেশে মুক্তিযুদ্ধের কথা নির্ভয়ে বলা যাবে না, এমনটা কখনো ভাবনাতেই আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধা লুতফা হাসীন রোজী।
একাত্তরে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর হয়ে লড়াই করা এই গেরিলা সদস্য বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলতে গেলে এই স্বাধীন দেশে ভয় পেতে হবে, তা তো ভাবিনি। এখন ‘জয় বাংলা’ বললে গ্রেপ্তারের ভয় পেতে হয়, এমন বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি।”
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এর তৃতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে সংকলনটির মোড়ক উন্মোচন হয়। সংকলনের দুটি খণ্ড আগেই প্রকাশ হয়েছে।
তৃতীয় খণ্ডের মোড়ক উন্মোচনে এসে বর্তমান প্রজন্মের সমালোচনা করেন লুতফা হাসীন রোজী।
তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্ম অনেক স্মার্ট। তারা ফেইসবুক, ইউটিউবে ভিডিও ভাইরাল করে দিতে পারে। কিন্তু তারা নিজ দেশের জন্ম-ইতিহাসটা ঠিকমতো জানে না।”
জুলাই অভ্যুথানকে কেউ কেউ একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও মনে করেন তিনি।
“শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি মানুষ ক্ষোভ থেকে পথে নেমেছিল। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তি মনে করছে, তাদের আদর্শে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সবাই রাস্তায় নেমেছে। সেটা তো হয়নি।”
তিনি বলেন, “চব্বিশের অভ্যুথানকে কেউ কেউ বলছে, ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’। তারা আসলে জানেই না স্বাধীনতা কী? এই দেশের স্বাধীনতার জন্ম ইতিহাস তারা জানে না। ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর বললেন, ‘রিসেট বাটন টিপে দিয়েছেন’।
“ড. ইউনূস তো অনেক শিক্ষিত মানুষ। তবুও কি তিনি জানেন না যে ইতিহাসের ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেওয়া যায় না। ইতিহাস তার শক্তিতেই টিকে থাকে। যারা এই দেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়, তারা ইতিহাস জানে না।”
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনাও করেন লুতফা। বলেন, “একটা জাতি তো গড়ে ওঠে শিক্ষার মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে এখনো ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা আর ইংরেজি মাধ্যম। এখানেই তো বৈষম্যের সূচনা হয়।
“শেখ হাসিনা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য মাদ্রাসার সিলেবাসকে আধুনিক না করেই তাদেরকে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এটা একটা ভয়াবহ বাজে সিদ্ধান্ত, যার ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
ভাষাসংগ্রামী আবু জায়েদ শিকদারের মেয়ে লুতফা হাসীন বাবার মুখে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের কথা শুনে শুনে বড় হয়েছেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বিপ্লবী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় লুতফা হাসীন রোজী ছিলেন আজিমপুর স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিনি বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর গেরিলা সদস্য হিসেবে গোপীবাগ অভিযানে অংশ নেন।
লুতফা হাসীন রোজী বলেন, “২৫ মার্চে আমরা ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের বাসায়। চারদিকে ভয়াবহ তাণ্ডব আর হত্যাযজ্ঞ দেখে বাবা বলেছিলেন, ‘দোয়া-দুরুদ পড়ো’। আমরা সেদিন বাঁচতে পারব, সেই আশা করিনি।”
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ডামি রাইফেল হাতে নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলে লুতফা হাসীনও যোগ দিয়েছিলেন। এর আগে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।”
লুতফা হাসীন রোজী আশা করেন, নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানবে।
মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাসকে জানার ক্ষেত্রে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনটি আকরগ্রন্থ হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।
