ড. মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
২৫ মার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গভীর শোকের দিন, যা “কালোরাত্রি” হিসেবে পরিচিত। এই রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত “অপারেশন সার্চলাইট” ছিল একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা, যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নির্মমভাবে দমন করার চেষ্টা করা হয়।
এই অভিযানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে বর্বরতা চালায় তা মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস উদাহরণ। গভীর রাতে নিরস্ত্র, ঘুমন্ত মানুষের ওপর ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, হলগুলো রক্তে ভেসে যায়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন-এ সাহসী পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধ দমন করতে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই এই নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি।
আমার দৃষ্টিতে, এই বর্বরতা শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না; এটি ছিল একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা। তাই এই ঘটনাকে যথার্থভাবেই গণহত্যা বলা হয়।
আমার মতে, এই ঘটনার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যকে স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া শুধু কূটনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক কর্তব্যও। একটি জাতির ওপর সংঘটিত গণহত্যার জন্য দায় স্বীকার করলে তা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে, ২৫ মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করাও অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববাসীর কাছে এই সত্য তুলে ধরা দরকার, যাতে এটি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত একটি গণহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবিকেও শক্তিশালী করবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর অবদান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখাননি, বরং তা বাস্তবায়নের পথও দেখিয়েছেন। ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতারের পূর্বে তিনি স্বাধীনতার বার্তা ওয়ারলেসের মাধ্যমে প্রেরণ করেন, যা পরবর্তীতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা নিশ্চিত করে। তাঁর এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। তাঁর নামেই, তাঁর নেত্তৃত্বেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমান-এর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করে।
সবশেষে, আমি মনে করি ২৫ মার্চ শুধু শোকের প্রতীক নয়, বরং একটি শিক্ষা। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
