৪ এপ্রিল ১৯৭১, পাম সানডে। খ্রিস্টানদের জন্য এটা পবিত্র সপ্তাহের শুরু। যিশুখ্রিস্টের জেরুজালেমে প্রবেশের স্মরণে বিশ্বের সব চার্চে সেদিন প্রার্থনা হয়। যশোর শহরের ক্যাথলিক চার্চ কম্পাউন্ডে ফাদার মারিও ভেরোনেসি সকাল থেকে ব্যস্ত ছিলেন। ২৫ মার্চের পর থেকে তার চার্চে শরণার্থীর ঢল। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, সব ধর্মের মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে যারা পারছিলেন চার্চের দেওয়ালের ভেতরে এসে জড়ো হচ্ছিলেন। ফাদার ভেরোনেসি তাদের খাওয়াচ্ছিলেন, কাপড় দিচ্ছিলেন, আশ্রয় দিচ্ছিলেন।
সেদিন সকালে পাকিস্তানি সেনারা রাইফেল আর সাবমেশিনগান নিয়ে চার্চ কম্পাউন্ডে ঢুকল। ফাদার ভেরোনেসি বেরিয়ে এলেন। হাত তুলে দিলেন। বুকে লাল ক্রুশ চিহ্ন, কারণ চার্চের পাশেই ছিল ফাতিমা হাসপাতাল। সাদা পোশাক, হাত তোলা, বুকে ক্রুশ। এই মানুষটার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, কোনো হুমকি নেই। ৫৮ বছর বয়সী এক পুরোহিত শুধু তার শরণার্থীদের রক্ষা করতে বেরিয়ে এসেছেন।
সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে গুলি করল। বুকে গুলি লাগল। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। সেনারা তারপর ভেতরে ঢুকে চার্চে আশ্রয় নেওয়া চারজন শরণার্থীকেও গুলি করে হত্যা করল।
এই ঘটনাটার লিখছি যখন, এখানে তখন অনেক রাত। কিন্তু আমার চোখের সামনে ভাসছে পাম সানডের সকালে, ক্রুশের চিহ্ন বুকে, হাত তুলে একজন পুরোহিত দাঁড়িয়ে আছেন। এটা কোনো যুদ্ধের দৃশ্য না। এটা একটা হত্যার দৃশ্য। পাকিস্তানি সেনাদের কাছে হাত তোলা একজন মানুষও নিরাপদ ছিল না। পুরোহিতও না।
ফাদার মারিও ভেরোনেসি ইতালির মানুষ। ১৯ বছর পূর্ব পাকিস্তানে কাটিয়েছিলেন। বাঙালিদের ভালোবাসতেন, বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নে বিশ্বাস করতেন। তার মৃত্যুর পর মুসলমান ছাত্র ইসমাইল হোসেন চিঠি লিখেছিলেন: “ফাদার মারিও ভেরোনেসি আমাদের স্বাধীনতার শহীদদের মধ্যে একজন। আমরা তাঁকে নিয়ে গর্বিত।” এই চিঠিটা বলে দেয় মানুষটা কেমন ছিলেন।
একই বছরের ২৩ নভেম্বর। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার গোল্লা ক্যাথলিক চার্চের পুরোহিত ফাদার উইলিয়াম পি. ইভান্স। আমেরিকার মানুষ, হলিক্রস কংগ্রেসনের সদস্য। সপ্তাহে একদিন নৌকায় করে কয়েক কিলোমিটার দূরে বক্সনগর গ্রামে ম্যাস পড়াতে যেতেন। সেদিনও যাচ্ছিলেন। নবাবগঞ্জের কাছে পাকিস্তানি সেনার ক্যাম্প পেরোনোর সময় সৈন্যরা নৌকা থামাতে বলল।
নৌকা ভিড়ল। সৈন্যরা ফাদার ইভান্সকে ধরে নামাল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে এত জোরে আঘাত করল যে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর বেয়নেট দিয়ে একাধিকবার খোঁচাল। শেষে দুটো গুলি করল। লাশ নদীতে ছুঁড়ে দিল।
নদীর স্রোত লাশ কয়েক কিলোমিটার বহন করে নিয়ে গেল। সাধারণ মানুষ লাশ উদ্ধার করলেন। গোল্লা চার্চের কবরস্থানে সমাহিত করলেন। সেদিন হাজার হাজার মানুষ এলেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান। কারণ ফাদার ইভান্স সবার মানুষ ছিলেন। এলাকার মানুষ তাঁকে “পবিত্র মানুষ” বলত।
এই দুজন পুরোহিতের হত্যার মধ্যে একটা কথা পরিষ্কার হয়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধর্মীয় পরিচয় কোনো সুরক্ষা ছিল না। ইসলামের নামে যুদ্ধ করছে বলে দাবি করা একটা বাহিনী খ্রিস্টান পুরোহিতকে গুলি করছে। রেড ক্রুশ চিহ্নিত পুরোহিতকে গুলি করছে। হাত তোলা মানুষকে গুলি করছে। এটা ধর্মীয় যুদ্ধ না। এটা ক্ষমতার গণহত্যা, যেখানে ধর্মের লেবাসটা ছিল শুধু একটা অজুহাত।
বাংলাদেশ জেনোসাইড আর্কাইভের তথ্য বলছে তৃতীয় একজন স্থানীয় ক্যাথলিক পুরোহিতও ১৯৭১ সালে নিহত হয়েছিলেন। তিনি বাঙালি, তাঁর নাম ফাদার মারান্ডি। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত, কিন্তু তিনিও এই বাহিনীর শিকার।
তিনজন পুরোহিত খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে। কিন্তু গল্পটা শুধু এই তিনজনের না।
সারা বাংলাদেশে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ কম্পাউন্ডগুলো ১৯৭১ সালে একটা অদ্ভুত ভূমিকা পালন করেছিল। মানুষ বিশ্বাস করত চার্চের দেওয়ালের ভেতরে থাকলে হয়তো বাঁচা যাবে। পাকিস্তানি বাহিনী বিদেশিদের সাথে সরাসরি সংঘাতে যেতে একটু সতর্ক ছিল। সেই সুযোগে চার্চগুলো হয়ে উঠেছিল শরণার্থী শিবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ২৫ মার্চের রাতে গুলি খেয়ে ৩০ মার্চ মারা গেলেন। তাঁর স্ত্রী বাসনা এবং মেয়ে মেঘনাকে হলিক্রস স্কুলের ক্যাথলিক নানরা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাদের ইউরোপীয় নাম দিয়েছিলেন, হিন্দু পরিচয় গোপন রাখতে। এই কাজটা করতে গিয়ে নানরা নিজেরাও ঝুঁকিতে ছিলেন।
নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ অঞ্চলে গারো খ্রিস্টানদের উপর আক্রমণ হয়েছে। গারো সম্প্রদায় মূলত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। তারা আদিবাসী, তারা খ্রিস্টান, তারা সংখ্যালঘু। তিনটি পরিচয়ে তিনবার লক্ষ্যবস্তু। রাজাকাররা গারো গ্রামগুলো চিনত। পাকিস্তানি বাহিনীকে নিয়ে গেছে। ময়মনসিংহের গারো পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় গারো পরিবারগুলো আক্রান্ত হয়েছে, গির্জা ভাঙা হয়েছে।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর এই নির্যাতনের একটা বিশেষ দিক হলো, পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসররা চার্চকে প্রতিরোধের কেন্দ্র মনে করত। কারণটা স্পষ্ট। বিদেশি মিশনারিরা বিশ্বকে সত্যি কথা বলতে পারেন। ফাদার রিচার্ড ডব্লু. টিম, হলিক্রসের মার্কিন মিশনারি, ১৯৭১ সালে গোপনে আমেরিকায় চিঠি পাঠিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনার গণহত্যার বিবরণ দিয়ে। সেই চিঠিগুলো মার্কিন জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী জানত বিদেশি মিশনারিরা বিপদজনক সাক্ষী।
কারিতাস বাংলাদেশ, তখন কোর নামে পরিচিত, পুরো ১৯৭১ সালজুড়ে শরণার্থীদের সহায়তা করেছে। এই সংস্থার কাজে বাধা দিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। ত্রাণকর্মীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। চার্চ পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জেনোসাইড আর্কাইভের দলিলপত্র সরাসরি বলেছে, খ্রিস্টানরা হিন্দুদের তুলনায় কম আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু “তুলনামূলকভাবে কম” মানে নিরাপদ না। তিনজন পুরোহিত নিহত হয়েছেন। অজস্র চার্চ কম্পাউন্ড হুমকির শিকার হয়েছে। গারো খ্রিস্টান পরিবারগুলো আক্রান্ত হয়েছে। বিদেশি মিশনারিদের হত্যা করা হয়েছে। এই “কম আক্রান্ত” হওয়াটা কোনো অনুগ্রহ না। এটা শুধু এই কারণে যে খ্রিস্টানরা সংখ্যায় কম ছিলেন, তাই তাদের হত্যার সুযোগও কম ছিল।
পাকিস্তানি রাষ্ট্র এবং জামায়াতে ইসলামীর যে মতাদর্শ বাঙালিদের হত্যা করেছিল, সেই মতাদর্শ খ্রিস্টান পুরোহিতের বুকে গুলি করতেও দ্বিধা করেনি। ফাদার মারিও ভেরোনেসি পাম সানডের সকালে হাত তুলে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই হাত তোলা মানুষটাকে গুলি করার যে মানসিকতা দরকার, সেটা কোথা থেকে আসে? ধর্মের মুখোশ পরা বর্বরতা থেকে।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপুঞ্জি :
১) Bangladesh Genocide Archive: Bangladesh War of Independence: West Pakistani Soldiers Kill Catholic Priests, genocidebangladesh.org
২) Jerome D’Costa, Bangladeshey Catholic Mondoli (The Catholic Church in Bangladesh), Pratibeshi Prakashani, Dhaka, 1986
৩) Bitter Winter: The 1971 Genocide in Bangladesh: Still Unacknowledged, Says a New Documentary, July 2023, bitterwinter.org
৪) UCA News: Bangladeshis mourn U.S. missionary who served more than six decades, 2020। Hindu American Foundation: 1971 Bengali Hindu Genocide, hinduamerican.org
৫) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, খণ্ড ৩, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ১৯৮২
৬) Bangladesh Genocide Archive, genocidebangladesh.org
