নিজস্ব প্রতিনিধি
স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিতর্ককে অনেক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয় মিডিয়া সেলের উচ্চ পর্যায়ে এই ইস্যুতে অভূতপূর্ব মাতামাতি দেখা যাচ্ছে। জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের দাবি, বেগম খালেদা জিয়ার দুই দফা ক্ষমতাকালেও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে এতটা অতিরঞ্জিত ও এককভাবে তুলে ধরা হয়নি।
সম্প্রতি নতুন পাঠ্যপুস্তকে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করা, রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্য এবং টেলিভিশন-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরাম আলোচনা চলছে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
এই বিতর্কের মাঝে দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি ব্যাহত হয়েছে। ফলে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, রেশনিং, কোথাও কোথাও তেল ফুরিয়ে যাওয়া এবং প্যানিক বাইং দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঈদের পর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ আরও চাপে পড়েছে। সরকার বলছে, কোনো স্থায়ী সংকট নেই এবং নতুন চালান আসছে, কিন্তু জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে।
একই সঙ্গে চলতি ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় রেকর্ড সংখ্যক প্রাণহানি ঘটেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, ৮ দিনের ঈদ যাত্রায় অন্তত ২০৪ জন নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রে এ সংখ্যা ৪০ থেকে ২৫০ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা ও যানবাহনের চাপকে দায়ী করা হচ্ছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দুটি গুরুতর সংকট—জ্বালানি হাহাকার এবং ঈদ দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি—থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখতেই স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এতটা মিডিয়া ও রাজনৈতিক তৎপরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে জ্বালানি সংকট এবং দুর্ঘটনার খবর অনেকটা আড়ালে চলে গেছে, যেখানে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে আলোচনা প্রধান হয়ে উঠেছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর (২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর) ইতিহাস পুনর্লিখনের অভিযোগ উঠেছে। খালেদা জিয়ার আমলে এতটা তীব্রতা ছিল না বলে জ্যেষ্ঠ নেতারা দাবি করছেন। সরকারপক্ষ অবশ্য বলছে, এটি ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অকাট্য দলিল “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র”, যা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে তথ্য মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগ্যে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিলো, সেখানে বীর উত্তম জিয়াউর রহমান প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এমন কোন তথ্য সন্নিবেশিত হয়নি, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজেও কোথাও এ দাবী করেননি, বা উক্ত দলিল সংশোধন এর জন্য প্রভাব বিস্তার করেননি। তাহলে এতো বছর পরে কেন জোরপূর্বক আনকোরা নতুন ইতিহাস চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, সে নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে।
বিরোধীদল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক নিরাপত্তার মতো জনদুর্ভোগের ইস্যুতে সরকারের দুর্বলতা ঢাকতেই এই বিতর্ককে সামনে আনা হয়েছে। জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে—পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, দুর্ঘটনায় পরিবার হারানো মানুষের আর্তনাদ—এসব খবর এখন কমই আলোচিত।
“ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই চলতে পারে, কিন্তু যখন দেশে জ্বালানি সংকট ও সড়ক দুর্ঘটনায় শত শত প্রাণ চলে যাচ্ছে, তখন এতটা একচেটিয়া মনোযোগ দেওয়া জনগণের দুর্ভোগকে অস্বীকার করার শামিল।” সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া আসেনি এ অভিযোগের বিষয়ে।
তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, চাহিদার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলাদা তদন্ত ও সচেতনতা কর্মসূচির কথা শোনা যাচ্ছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিহাসের বিতর্ক কতটা জনকল্যাণকর এবং কতটা রাজনৈতিক কৌশল—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে। জনগণের প্রত্যাশা, সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার দেবে।
