বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ একটি বিভীষিকাময় ও চরম শোকাবহ দিন। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি রক্তে ভেজা এক অবিনশ্বর অধ্যায়। এই কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হায়েনারা যখন আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা ভেবেছিল অস্ত্রের মুখে একটি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা জানত না, আগুনের লেলিহান শিখা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে এক অজেয় জাতিসত্তা। এই বর্বরোচিত ও পরিকল্পিত গণহত্যা ছিল সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। যখন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বুঝতে পারল যে গণতান্ত্রিক উপায়ে বাঙালির স্বাধিকারের দাবি দমানো সম্ভব নয়, তখনই তারা বেছে নেয় অস্ত্রের ভাষায় মুখ বন্ধ করার হীন পথ। এই কালরাত্রির ধ্বংসস্তূপ থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং বিশ্বমানচিত্রে এক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে টালবাহানা শুরু করে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” বলে ঘোষণা দিলেন, তখন থেকেই বাঙালি জাতি চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। অন্যদিকে, আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো গোপনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সৈন্য এবং অস্ত্র মজুদ করতে থাকেন। ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় যখন ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন, তখনই বাঙালির ভাগ্যাকাশে ঘনিয়ে আসে কালরাত্রির অন্ধকার। অপারেশন সার্চলাইটের নামে সেই রাতে নিরপরাধ ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলা চালানো হয়। জেনারেল টিক্কা খান এবং রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে এই গণহত্যার ছক আঁকা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালির মুক্তির চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং এদেশের ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সামরিক-বেসামরিক বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা।
রাত ১১টা ৩০ মিনিটের পর ঢাকা শহর কেঁপে ওঠে ট্যাংক, কামান আর মেশিনগানের গর্জনে।
পিলখানায় তৎকালীন ইপিআর সদর দপ্তর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। জীবন বাজি রেখে বাঙালি পুলিশ সদস্য ও জোয়ানরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে তারা টিকতে না পারলেও, তাদের সেই বীরত্বগাথা পরবর্তী দীর্ঘ যুদ্ধের মহান অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গণহত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় ঢুকে ছাত্র ও শিক্ষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং অধ্যাপক মুনীরুজ্জামানসহ বহু মেধাবী শিক্ষক সেদিন প্রাণ হারান। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রূপ নেয় এক বধ্যভূমিতে। নরপিশাচরা কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা রকেট লাঞ্চার দিয়ে হলগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়।
২৫শে মার্চের সেই চরম মুহূর্তেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে আলোচনার পথ চিরতরে বন্ধ। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দেশবাসীকে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার আহ্বান জানান। এই ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তাঁর সেই অমোঘ বাণী ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুক্তিকামী মানুষকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত প্রেরণা দেয়। এই হত্যাকাণ্ড ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা। আর্চার ব্লাডসহ বিদেশি সাংবাদিকরা সেই রাতের ভয়াবহতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন যে, সেই রাতে কেবল ঢাকাতেই প্রায় সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আজ বাংলাদেশে এই দিনটিকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আজও আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে এমন কিছু অপশক্তি বিদ্যমান যারা ২৫শে মার্চের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে অস্বীকার করতে চায়। রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসদের প্রেতাত্মারা আজও একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বিকৃত করে নতুন প্রজন্মের কাছে ভুল তথ্য পরিবেশন করতে চায়। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ দুই দশকের লড়াই ও নেতৃত্বকে যারা বিতর্কিত করতে চায়, তারা মূলত বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ—এই দুটি সত্তা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা এই ধ্রুব সত্যকে আড়াল করতে চায়, তারা আর যাই হোক, এদেশের হিতাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না। এরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া সেই ‘জাতীয় বেঈমান’ ও ‘দেশদ্রোহী’, যাদের ক্ষমা করার অধিকার ইতিহাস কাউকে দেয়নি।
২৫শে মার্চ তাই কেবল শোকের রাত নয়, এটি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর মাহেন্দ্রক্ষণ এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত শপথের রাত। শহীদের রক্ত আর লক্ষাধিক মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কোনো দান বা দয়া নয়, এটি তিরিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কেনা এক অমূল্য সম্পদ। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার মন্ত্র। আমাদের পবিত্র দায়িত্ব হলো স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস রক্ষা করা এবং দেশদ্রোহীদের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। যে রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র পথ হলো ইতিহাসের সত্যকে আগলে রাখা এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়া।
