২৫ মার্চ, আমার মায়ের জন্মদিন। আমি কখনো আমার সামাজিক মাধ্যমের টাইমলাইনে আমার মা’কে শুভেচ্ছা দেইনা। কাটিনা কেক। কারণ, এই দিনে ১৯৭১ এ শত শত মানুষ পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। নির্বিচারে নিরীহ মানুষের উপর চালানো হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। আমার ছেলে আজ সকাল থেকে প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত।আমার ভাই হাসপাতালে ভর্তি।

কিন্ত কিছুই দমাতে পারেনি আমাকে, ছুটে গিয়েছি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। যেখানে আয়োজন হয়েছে আলোর মিছিল। সন্ধ্যা ছয়টায় শহিদ মিনারে গেলাম। গিয়ে দেখি লাইভ পেইন্টিং হচ্ছে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে। কেউ কেউ কবিতা আবৃত্তি করছেন। কবিতা আমার প্রাণ। আমার শিরায় কবিতা। কবি দম্পতির সন্তান আমি। সেই শিরায় জেগে উঠল আহবান। সঞ্চালককে বললাম, আমি আবৃত্তি করব।

কোন রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া আবৃত্তি করলাম সিকান্দার আবু জাফরের বিখ্যাত কবিতা ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’। এর কিছুক্ষন পর দাঁড়িয়ে গেলাম মোমবাতি প্রজ্বলনে। আমরা কেউ কাউকে আগে থেকে চিনিনা। কিন্ত এক সাথে যখন গাইতে শুরু করলাম, জাতীয় সংগীত। তখন মনে হচ্ছিল আমরা সবাই সবাইকে চিনি। এই একটি গানের এত শক্তি যে পরিচিত অপরিচিত সব নদীকে এক মোহনায় মিলিয়ে দেয়।

জাতীয় সংগীতের গানের এক পর্যায়ে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। মোমবাতির আলো জ্বলে -নিভে। বৃষ্টি বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইল আমাদের একাত্মতা। না পারেনি। বৃষ্টিকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদা ম্যাম, জামিলা ম্যাম, সিদ্ধার্থ স্যার আর আমি উপস্থিত হলাম জগন্নাথ হল গণ কবরে। সেখানে মোমবাতি প্রজ্বলন করব বলে। ওখানে এলেন অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুজ্জামান স্যার। স্যার অবশ্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও ছিলেন। বৃষ্টির এক পর্যায়ে স্যারকে হারিয়ে ফেলি। যাই হউক জগন্নাথ হলে মোমবাতি প্রজ্বলন করার সময় আবার আর এক দফা বৃষ্টি।
পুনরায় আবার ভিজলাম। তারপর ও শান্তি। আলো জ্বালাতে পেরেছি। বৃষ্টির মধ্যে শহিদ মিনারে সবাই একসাথে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে পেরেছি। বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবি, যে ২৫ মার্চ, ৭১ এ জীবন দিয়েছেন বুদ্ধিজীবী সহ সাধারণ জনগণ।
তাদের স্মরণে একদিন না হয় বৃষ্টিতে ভিজলাম, মায়ের জন্মদিন পালন না হয় না করলাম, ভাইকে হাসপাতালে সময় না হয় নাই দিলাম, বাসায় জ্বরাক্রান্ত সন্তানের পাশে না হয় না থাকলাম। কিন্ত দেশের মানুষের সাথে এক কন্ঠে মিলিয়ে বলতে ত পারলাম, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।

ছোটবেলা আব্বুর লেখা কবিতার যে চরণ আমাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে বারবার, ‘স্বদেশ প্রেম ঈমানের অংগ, হুববুল ওয়াতান মিনাল ইমান, প্রিয় স্বদেশে মরব হেসে, দেশের মাটি মায়ের সমান’। এই একটি কবিতা আমার পথচলায় অনুপ্রেরণা দেয়। দেয় উন্নত শিরে চলার শক্তি।
গত বছর স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের আয়োজনে শামিল হয়েছিলাম। কয়েকজন কিশোর কিশোরী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকর্তা এবং আমি একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাড়া কেউ যায়নি। হাত গোণা ১০/১৫ জন। আজ সেই দিন পুনরায় ফিরে এসেছে। আজ ও যাব মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। পরিচিত কার সাথে দেখা হবে কিনা জানিনা। তবু যাবো। প্রাণের টানে।মায়ার টানে। দেশের টানে। জাতীয় সংগীতের সুরের টানে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত আয়োজনের অন্যতম সংগঠক কামাল পাশা চৌধুরী তার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘বুকে বিশ্বাস নিয়ে ডাক দিলে মানুষ পাশে দাঁড়াবেই। ২৫মার্চ কালরাত ও ৩০ লক্ষ শহীদের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপছে উঠেছিল মানুষ। বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি সাহিত্যিক, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, আবৃত্তিকারসহ হাজার জনতা। চিত্রশিল্পীরা এঁকেছেন লক্ষ শহীদ স্মরণে অনুপম চিত্র, আবৃত্তি হয়েছে শহীদ স্মরণের বিখ্যাত কবিতা গুলো। বহুদিন পর দেখা হয়েছে পরস্পরে।
শোক ও ক্ষোভের দমিত আবেগ বুকে নিয়ে এই স্মরণ অনুষ্ঠান যেন ইতিহাসের এক নতুন যাত্রা। আর আমি বাসায় কাকভেজা হয়ে ফিরে লিখেছি আমার সামাজিক মাধ্যমের টাইমলাইনে, ‘আজ সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে জগন্নাথ হল, গণ কবর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ছিল শহিদ মিনারে আসা সবার। কিন্ত না বাধ সাধল বৃষ্টি। সবাই যেতে পারেনি।
সম্মিলিত আয়োজনের অংশ হিসেবে বৃষ্টির আগেই পাঠ করলাম “জনতার সংগ্রাম চলবেই’ কবিতা, এরপর সবাই একসাথে মোমবাতি প্রজ্বলন করে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের শেষ পর্যায়ে বৃষ্টি নামল। সবাই যার যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেন।শুধু রইলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদা ম্যাম, জামিলা ম্যাম আর সিদ্ধার্থ স্যার এবং আমি। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম জগন্নাথ হল, গণ কবর। ওখানে বৃষ্টি শেষ হবার পর আসল জগন্নাথ হল এলামনাই এসোসিয়েশন। এখানে মোমবাতি প্রজ্বলন করার সময় আবার ঝুম বৃষ্টি। এরপর রয়ে গেলাম আবার আমরা চার জন। এভাবেই সবাই চলে যায়।থেকে যায় কেউ কেউ।
তবে যারা থেকে যায় তারা সুসময়ে হারিয়ে যায়, তখন দুধের মাছিরা উড়ে বেড়ায় এই আর কি।কত দুধের মাছি দেখলাম, যারা সর খেয়ে উড়ে গিয়েছে। খবর ও নাই।
যাই হউক ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি চেয়ে কেন্দ্রিয় শহিদ মিনারে বিভিন্ন গণ মাধ্যমে বক্তব্য রেখে আসছি। আল্লাহ ভরসা। এই যে বারে বারে বৃষ্টিতে ভিজেছি, তারপর ও মনে হয়নি আমি ভিজেছি। কেননা, ২৫ মার্চ,৭১ এ বাংলার মাটি শত শহিদের রক্ত দিয়ে ভিজে ছিল। তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে পারব কি?’
আমার এই পোস্টে কিছু ছবির সাথে সংযুক্ত করেছি একটি গান, ‘ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমোনা।’ লেখার শেষ পর্যায়ে আমিও আহবান রেখে গেলাম, ‘ও আলোর পথ যাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমোনা’। মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।
