ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ২৩ মার্চ, ১৯৭১। নিয়মমাফিক দিনটি হওয়ার কথা ছিল ‘পাকিস্তান দিবস’। কিন্তু নিস্তরঙ্গ নিয়মের বেড়ি ভেঙে সেই দিনটিকে বাঙালির ‘প্রতিরোধ দিবস’-এ রূপান্তর করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাত মার্চের সেই তর্জনী হেলনের পর ২৩ মার্চের সকালটি ছিল বাঙালির চূড়ান্ত স্বাধীনতার মহড়া। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সর্বত্র পাক-পতাকার দর্প চূর্ণ করে নীল আকাশে সগৌরবে উড়ল সবুজের বুকে লাল বৃত্ত আর সোনালি মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
সেদিন ভোরের আলো ফুটতেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মুক্তিপাগল মানুষ। তাঁদের জয়ধ্বনি আর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুরের মাঝে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে উত্তোলন করেন আগামীর স্বাধীন দেশের পতাকা। সেই এক উত্তোলন যেন কয়েক দশকের শোষণ আর বঞ্চনার শিকল ছিঁড়ে ফেলার অঘোষিত পরোয়ানা। এর পরেই দাবানলের মতো সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে। সচিবালয় থেকে হাইকোর্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজারবাগ— সর্বত্র পাক-নিশান নামিয়ে ওড়ানো হয় বিদ্রোহের জয়পতাকা।
সেদিন গোটা ঢাকায় পাকিস্তানি শাসনের চিহ্ন টিকে ছিল কেবল প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর হাউস আর ক্যান্টনমেন্টের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। বাকি জনপদ ছিল বঙ্গবন্ধুর ‘অসহযোগ’ মন্ত্রে দীক্ষিত। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কুচকাওয়াজ আর পল্টন ময়দানের জনসমুদ্রে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল একটাই শব্দ— ‘স্বাধীনতা’। সাত মার্চের ভাষণে যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলেছিল, ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলন তাকে পরিণত করেছিল এক দাবানলে। যার ঠিক তিন দিন পরেই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শুরু হয় বাঙালির মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। ৫৪ বছর আগের সেই দিনটি আজও মনে করিয়ে দেয়, একটি পতাকা মানে কেবল এক টুকরো কাপড় নয়, তা কোটি প্রাণের রক্তে কেনা এক অবিনাশী স্বপ্ন।
