৫ আগস্ট,২৪ এ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পুড়িয়ে ফেলার পর সামাজিক মাধ্যমে অক্টোবর,২০২৪ এ দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুর পোড়া বাড়ির পোড়া গাছে পাতা এসেছে। এটা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি গাছটা দেখতে যাব।
তখন ৩২ এ যাওয়া মানে যুদ্ধের মত। বিপদ ডেকে আনার মত ব্যাপার। যদিও আমি ৩১.০৮.২০২৪ ইং তারিখ সন্ধ্যায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশির সাক্ষাৎকার এনেছিলাম। কিন্ত সেটা ছিল সন্ধ্যা, অন্ধকার। ১৩.১০.২০২৪ ইং তারিখ সকাল বেলা আমি বোরকা পরে গেলাম।
বাইরে থেকে অসহায়ের মত একা একা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আর চোখের পানি ফেলছিলাম।হঠাৎ দেখি আমাকে একজন বলতেছে, জেবা আপা আপনি এভাবে এখানে? আমি তাকিয়ে দেখি সে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কর্মকর্তা সজীব ভাই। সজীব ভাইকে দেখে আমি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লাম। বললাম, ভাই আমাকে ভিতরে নেয়ার ব্যবস্থা করুন।উনি বললেন রিস্ক হয়ে যায়।
আমি বললাম আমি রিক্স নিয়েই এসেছি। যা হয় হবে। আমি ভিতরে গেলাম, ভিতরে গিয়ে বিভিন্ন ছবি তুলেছি আর চোখের জলে ভেসেছি। আমার কান্না দেখে সজীব ভাই অবাক হয়েছিলেন।আমি বলেছিলাম ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমি টানা ৩৮ মাস গবেষণা করেছিলাম, নিজ অর্থায়নে।
আমি এ বাড়ির আনাচে কানাচে সব ইতিহাস জানি। তাই আমার কষ্টটাও বেশি। সেদিন চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরেছিলাম। এরপর পোড়া বাড়ির ছবিগুলো পাঠিয়েছিলাম প্রবাসী লড়াকু বন্ধু আফসানা কিশোয়ার লোচনকে।
তাকে বলেছিলাম, ছবিগুলো শেয়ার দিও। কিন্ত আমার ছবিগুলো লোচনকে দেইনি। বলেছিলাম, আমার নাম বলোনা। আমিই এক সময় বলব। সে ছবিগুলোর সাথে ভয়েস দিয়ে বলেছিল, আমার বন্ধু পাঠিয়েছে। সম্ভবত সেই ভিডিও ছিল প্রথম ভিডিও ৩২ নিয়ে। আমি লক্ষ্যা পাড়ের মেয়ে। আমি মেঘ, ঢেউ ভয় পাইনা । বরং এগুলো আমার শক্তি।
তাই সেদিন কোন কিছু ভাবিনি। শুধু ইচ্ছে যাব, গিয়েছি। নিরাপত্তার জন্য বোরকা পরেছি।সেদিন বুঝেছিলাম, যারা ৩২ ভেঙেছে তারা শীগ্রই ঘৃণিত হবে। ৭৫ এর পর বেশ কয়েকটি সরকার এসেছে, গিয়েছে, কেউ ৩২ ভাংগেনি। এটা সবাই জানে।
আজ ২৩ মার্চ।পাকিস্তান প্রতিরোধ দিবস। ৩২ থেকে বঙ্গবন্ধু পতাকা উড়িয়েছিলেন। এই বাড়িটা স্বাধীনতার স্বাক্ষি।
আমার বাবার লেখা কবিতাটি মনে পড়ছে
“বত্রিশ’ শব্দটির আছে দুটি ব্যাখ্যা,
এ ব্যাখ্যা মানে না যে পায় ‘রাজাকার’ আখ্যা।
বত্রিশ কি জানো তুমি?
বত্রিশ তোমার দাঁত।
এই দাঁতে খায় বাঙ্গালি
শাক, মাছ, ভাত।
বত্রিশ কি জানো তুমি?
বত্রিশ মুজিবের বাড়ি
এই বাড়িতে পায় বাঙ্গালি
স্বাধিনতা তারই’।
এই হলো বত্রিশ নিয়ে একজন কবির শ্রদ্ধা।
আজ এই স্মরণীয় দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। ১৩.১০.২০২৪ এ তোলা আমার ব্যক্তিগত ছবিগুলো আজ ১৮ মাস পর আপলোড করলাম।আমি জানি একদিন ঝড় থেমে যাবে বত্রিশ একদিন আগের মত দাঁড়াবে।
ইনশাআল্লাহ।কারণ, সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধে সত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়, মিথ্যা পরাজিত হয়। নশাআল্লাহ আমাদের সবার অংশগ্রহণে একদিন ৩২ দাঁড়াবে। দাঁড়াতে হবেই আমাদের প্রয়োজনে, বাংলাদেশের প্রয়োজনে। ৩২ কারো ব্যক্তিগত না । এটা রাষ্ট্রের সম্পদ।
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।
লেখকঃ ড. জেবউননেছা, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
