নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ‘গোল্ডেন স্পেকট্রাম’ নিলাম নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বাজারমূল্যের এই তরঙ্গ মাত্র ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় গ্রামীণফোনকে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। এই নিলামকে ‘অবৈধ ও একপেশে’ আখ্যা দিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে এমন একটি বিতর্কিত নিলামের আয়োজন করা হয়েছে যেখানে গ্রামীণফোন ছাড়া আর কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা হলেও রহস্যজনক কারণে তা মাত্র ২৪০০ কোটি টাকায় গ্রামীণফোনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। অন্য সব অপারেটর এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে সরে দাঁড়ালে গ্রামীণফোনই একমাত্র দরদাতা হিসেবে এই ‘গোল্ডেন স্পেকট্রাম’ হাতিয়ে নিতে যাচ্ছে।
এই নিলামের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শিক্ষানবিশ আইনজীবী রাইসা মৃধা সামান্তাসহ অন্যান্যরা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল এবং বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেছেন। রুলে আদালত জানতে চেয়েছেন—কেন এই নিলাম প্রক্রিয়াকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না?
আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, ইউনুস সরকারের প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয়ে এই নিলামটি করা হয়েছে। তারা মনে করেন, দেশে ‘ক্ষমতায় থাকলে অনিয়ম করার সংস্কৃতি’ এখনো বজায় রয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে এই একতরফা নিলামে। ৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ মাত্র ২৪০০ কোটি টাকায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিশাল ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের মতো অপারেটররা অংশ না নেওয়ায় নিলামের মূল শর্ত ‘প্রতিযোগিতা’ এখানে অনুপস্থিত ছিল। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিটিআরসির এই ত্বরিত সিদ্ধান্তকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রিটকারী রাইসা মৃধা সামান্তা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গড়া। কিন্তু আমরা দেখছি একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পানির দরে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনস্বার্থবিরোধী এই মনোপলি আমরা মেনে নেব না।
আইনজীবীরা দাবি করেছেন, বিটিআরসিকে ব্যবহার করে ড. ইউনূস সরকার গ্রামীণফোনকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। যা মূলত দেশের টেলিকম বাজারে অন্যান্য ছোট অপারেটরদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যেব আগে দাবি করেছিলেন যে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় নিলাম বৈধ, তবে বর্তমান রুল জারির পর বিটিআরসির অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তারা এখন আদালতের চার সপ্তাহের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানালেও নিলামের স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
দেশের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ‘স্পেকট্রাম’ নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার শেষ কোথায় তা এখন উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জনমনে প্রশ্নঅন্তর্বর্তী সরকার কি তবে মুখে বৈষম্যবিরোধীর কথা বলে নিজেই দেশে বৈষম্য তৈরি করে গেছে।
