নিজস্ব প্রতিনিধি
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময় উত্তপ্ত বিতর্ক ছিল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই প্রকল্পটিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’, ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘মেগা দুর্নীতির ক্ষেত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তবে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতের নাজুক পরিস্থিতি এবং একের পর এক গ্রিড বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান লোডশেডিং ও উৎপাদন ঘাটতি মোকাবিলায় রূপপুরই হতে পারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ।
২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিএনপির মিডিয়া সেল আয়োজিত এক সেমিনারে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান রূপপুর প্রকল্পকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, “পরিবর্তিত বিশ্বে নিউক্লিয়ার পাওয়ারের প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে। সরকার এই অপ্রয়োজনীয় জিনিস আঁকড়ে ধরে বাহাদুরি নিতে চাচ্ছে, যা একটি বাচ্চা ছেলের কাজের মতো।”
বিএনপির পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল অভিযোগগুলো ছিলো, অত্যধিক ব্যয়, জনঘনত্ব ও ঝুঁকি, পরিবেশ বিপর্যয়। সেদিন বিএনপি দাবি করেন, ভারতের কুদামকুলান প্রকল্পের তুলনায় রূপপুরের ব্যয় কেন দ্বিগুণ (১২.৮০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের আশঙ্কা) তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০০০-এর বেশি মানুষ বসবাসকারী দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনাকে ‘অপরিণামদর্শী’ বলা হয়েছিল। পদ্মা নদীর পানি ব্যবহার ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বিএনপির সেই আশঙ্কার বিপরীতে বর্তমান বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত রূঢ়। গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি বড় ইউনিট (৮৫০ মেগাওয়াট) যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। গ্রীষ্মের শুরুতেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি আমদানিতে ডলার সংকট এবং পুরনো কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড এখন চরম চাপের মুখে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুরের মতো একটি বিশাল বেইজ-লোড কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বৈশ্বিক বাজার ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র চালু হলে একনাগাড়ে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। যেটা গ্রিডকে স্থিতিশীলতা দেবে।
এর বিশাল সক্ষমতার ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হলে আশুগঞ্জের মতো কেন্দ্র শাটডাউন হলেও দেশে বড় ধরনের হাহাকার তৈরি হবে না। জ্বালানি নিরাপত্তায় পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) একবার লোড করলে দেড় থেকে দুই বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। যেটা বর্তমান জ্বালানি সংকটের সেরা সমাধান। এছাড়া কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প।
বিএনপি যখন এই প্রকল্পটিকে ‘অপরিণামদর্শী’ বলেছিল, তখন তাদের যুক্তিতে আর্থিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল। তবে বর্তমানের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাতগুলো জানান দিচ্ছে যে, একটি বড় ও স্থায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভাব কতটা প্রকট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রূপপুর কি পারবে বিএনপির সেই ‘অপ্রয়োজনীয়’ তকমা মুছে দিয়ে দেশের কোটি মানুষের ঘরে নিরবচ্ছিন্ন আলো পৌঁছে দিতে? দেশবাসী এখন সেই প্রত্যাশাতেই দিন গুনছে।
