নিজস্ব প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে প্রতারণার একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য ঘোষিত এই সুবিধাকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপির কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে টাকা আদায় ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। যা ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ফ্রামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় এক বিএনপি কর্মীর বিরুদ্ধে আইডি কার্ড সংগ্রহ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। শুধু সাতক্ষীরা নয় এই অনিয়মের শিকার সারাদেশ। কোথাও প্রকাশ পাচ্ছে কোথাও ফ্যামিলি কার্ডের নামে চলছে নিরব চাঁদাবাজি।
নরসিংদী সদর উপজেলার কাঁঠালিয়া ইউনিয়নে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক গৃহিণীর বাড়ি থেকে ব্যাংকের চেক বই চুরির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ইব্রাহীম মিয়ার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নাসিমা বেগম জানান, প্রতিবেশী হওয়ার সুযোগে ইব্রাহীম তাকে দারিদ্র্য বিমোচনের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করে দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নেন এবং জন্মনিবন্ধন সনদ করে দেওয়ার কথা বলে ৮ হাজার টাকাও দাবি করেন।
নাসিমার অভিযোগ, একদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কথা বলে ইব্রাহীম তার বাড়িতে গিয়ে গোপনে আলমারি থেকে ব্যাংকের চেক বই নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তার মেয়ে বিষয়টি দেখে ফেললে তিনি ধরা পড়েন। পরে চেক বইটি ফেরত দিলেও ভুক্তভোগীর দাবি, ভেতর থেকে ৪-৫টি চেকের পাতা গায়েব হয়ে গেছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নাসির আহমেদ বলেন, অভিযোগটি তাদের নজরে এসেছে এবং তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযুক্ত ইব্রাহীম মিয়া চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, কাগজপত্র নেওয়ার সময় ভুলবশত চেক বইটি তার হাতে চলে এসেছিল এবং পরে তিনি তা ফেরত দিয়েছেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ঘিরে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা রাসেল ওরফে জিলানী ও তার স্ত্রী নার্গিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ‘জিসান ট্রেডার্স’ নাম ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে ফ্যামিলি কার্ড বিক্রি করেছেন। এই ঘটনায় জনরোষের কারণে এই যুগলকে আটক করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, রমজানকে সামনে রেখে প্রায় ৩০০ পরিবারের কাছে ৫০ টাকা করে নিয়ে এসব কার্ড দেওয়া হয়। কার্ড দেখিয়ে প্রতি মাসে ১২৮৫ টাকায় ১৭২৫ টাকার পণ্য কেনার সুযোগ থাকবে বলে তাদের জানানো হয়।
কিন্তু নির্ধারিত দিনে পণ্য না পেয়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন কার্ড ক্রেতারা। এরপর ক্ষুব্ধ নারী-পুরুষরা একত্রিত হয়ে অভিযুক্তের বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয়দের দাবি, নরসিংপুর, বকুলতলা, চর কাশিপুর ও মধ্য নরসিংপুর এলাকার বেশিরভাগ কার্ড ক্রেতাই স্বল্পশিক্ষিত নারী ও নিম্নআয়ের মানুষ।
ফ্যামিলি কার্ড কিনেছিলেন এমন একজন, জুলেখা বেগম বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল সরকারিভাবে কোম্পানি থেকে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে। সকাল থেকে বসিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু এখন ফোনও ধরছে না।”
ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটু বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি থাকলেও এখনো এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। এর আগেই একটি প্রতারক চক্র কার্ড ছাপিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির রাজনৈতিক নেতাকর্মী অনলাইনে আবেদন করার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষকে বলছেন তারা সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড করে দেবেন। এর সুযোগ নিয়ে রিকশাচালক, দিনমজুর ও গ্রামের সহজ-সরল নারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। ফলে সুবিধা পাওয়ার আশায় অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
এদিকে, সরকার বলছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হবে না। তবে শুরুতেই এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, সাধারণ মানুষের সহায়তার জন্য নেওয়া উদ্যোগ যদি শুরুতেই প্রতারণা ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আবার কেউ কেউ জামায়াতের আমিরে সেই উপহাস মূলক কথা ‘রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড’ বলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কঠোর সমালোচনা করছেন।
