কারাবন্দী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। অন্যদিকে দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ রোগে ভুগছেন।
এ ছাড়া একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনেরা। আদালতে হাজিরা দিতে হলে পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় তাকে কারাগার থেকে আদালতে যেতে হয় বলেও পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
একই সঙ্গে সাংবাদিক দম্পতি ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদও বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলে দাবি করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকা এবং একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এসব সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের আগেই তাদের অনেকেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু গ্রেপ্তারের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
স্বজনদের দাবি, পরে তাদের এমন পরিবেশে আটক রাখা হয়েছে যা মানবিক আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করে না। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের কয়েকজনকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে আগের অসুস্থতা আরও বেড়ে গেছে এবং নতুন শারীরিক জটিলতাও দেখা দিয়েছে বলে পরিবারগুলোর দাবি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গ্রেপ্তারের পর শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার আবেদন একাধিকবার করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ বা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন বলেও তারা দাবি করেছেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজাম্মেল বাবু ২০২৪ সালে গ্রেপ্তারের কয়েক মাস আগে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করান। তবে কারাগারে যাওয়ার পর তার আগের কিছু শারীরিক জটিলতা আবার দেখা দিয়েছে বলে পরিবার মনে করছে। অন্যদিকে শ্যামল দত্ত ঘুমের মধ্যে সাময়িকভাবে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যায় ভুগছেন এবং তিনি ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত। কারাগারে একাধিকবার তিনি ও মোজাম্মেল বাবু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হওয়া শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। রূপার মায়ের মৃত্যুর পর তিনি কারাগারে শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
এদিকে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে জানায়, ৭৫ বছর বয়সী লেখক ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না এবং বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। সংস্থাটির দাবি, তাকে গ্রেপ্তারের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আটক অবস্থায় এমন পরিবেশে রাখা হয়েছে যা মানবিক আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করে না। পাশাপাশি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলেও তাকে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসার আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে বাবা–মা কারাগারে থাকায় শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপার একমাত্র সন্তান কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বাসার ঠিকানা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হওয়ায় কারাবন্দী সাংবাদিকদের স্বজনেরা আশা করছেন, এসব মামলার পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং অসুস্থ সাংবাদিকদের মুক্তি ও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ২৯৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যা চেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগে মামলা করা হয়। এর মধ্যে ১৯ সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সাংবাদিক সমাজের অভিযোগ, এসব মামলার অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত যথাযথ তদন্ত হয়নি বা তাদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
