মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার পরপরই প্রকাশিত এক প্রবন্ধে শেখ মুজিবুর রহমান-কে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ-কে স্বাধীনতার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধে এসব কথা উল্লেখ করেন তিনি।
প্রবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, “৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না।”
তিনি লেখেন, মার্চের শুরুতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেও বাঙালি ও অবাঙালি সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল।
লেখায় তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১ মার্চের পর শেখ মুজিবুর রহমান-এর আহ্বানে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, যা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রবন্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহিংস কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন জিয়াউর রহমান।
তিনি লেখেন, তার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তাকে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানি সেনারা বেসামরিক পোশাক পরে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে হামলা চালাত এবং পরে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসত।
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা শুরুতে নিজেদের বিজয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
লেখায় জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো এবং তাদের ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বলে কটাক্ষ করা হতো।
সামরিক প্রশিক্ষণেও শেখানো হতো যে বঙ্গবন্ধুই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শত্রু।
প্রবন্ধে তিনি বলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা প্রশ্নে দ্বন্দ্ব থেকেই বাঙালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়।
তার মতে, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা দেন—উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা—তখনই বাঙালির মনে জাতীয়তাবাদের চেতনা শক্তভাবে জেগে ওঠে।
পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান-এর পক্ষে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন জিয়াউর রহমান।
তার সেই ঘোষণায় বাঙালি সেনাসদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পরপরই লেখা এই প্রবন্ধটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং সেই সময়কার বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।
