আপনারা যে সারাদিন আমলাদের গালাগালি করেন, তাদের জায়গায় আপনারা হলে কী করতেন? নিজের দায়িত্বটা ঠিকমতো পালন করছেন? আপনাদের এত দেশপ্রেম তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন শুধু ডিগ্রি লাভের কারখানা হচ্ছে।
আমি এমন কয়েকজন সরকারি আমলা চিনি, যারা সত্যি নিজগুণে অনন্য, মেধা এবং সততার এক অসাধারণ সমন্বয়। দুর্নীতি, অর্থলোভ সব পেশায়ই আছে। নয়তো হেকেপ প্রজেক্টের নামে কোটি কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দিক দিয়ে খরচ হয়, সে তো চোখেও দেখা যায় না। শুধু কি হেকেপ? আইকিউএস নাকি কি একটা প্রজেক্ট আগে ছিল, তার অর্থ কীভাবে খরচ হয় আমরা কি ভেবে দেখেছি?
আমি বলছি না যে আমি পারফেক্ট। কারো পক্ষেই পারফেক্ট হওয়া সম্ভব নয়। তবে আমি মেধা, পরিশ্রম এবং সততায় বিশ্বাসী। সেই সাথে “বেশি টাকা দরকার নেই” এই ধরনের lazy man argument (অলস লোকের যুক্তি) একদম অপছন্দ করি।
প্রতিটি পেশার নিজস্ব কিছু ভালো বা মন্দ দিক আছে। আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে আপনি কেন সেই পেশায় আছেন। সেই সাথে কি কি করলে আপনার পেশাগত দক্ষতা বাড়বে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সারাদিন বিসিএস ভালো না, তারা লোভী, হেনতেন এসব বলা তো পরশ্রীকাতরতা।
বুয়েটে কারা চান্স পায়? এখন পর্যন্ত দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে পড়াশোনা টিকে আছে। বুয়েট পাস কেউ যখন বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে আসেন তার ওপর আস্থা রাখুন যে দেশের মেধাবীদের একজন প্রশাসনে আছেন। বলতে পারেন ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ দিয়ে কেন প্রশাসনে সে চাকরি করবে? প্রশাসন এমন কোনো টেকনিক্যাল বিষয় নয় যে অন্য ডিসিপ্লিন থেকে এসে কাজ করতে পারবে না। বরং আপনার দেখা উচিত একজন ইঞ্জিনিয়ার প্রশাসনে যাওয়ার ফলে দেশে ইঞ্জিনিয়ারের সংকট তৈরি হচ্ছে কিনা, অন্য ডিসিপ্লিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা।
দেশের এই একটা পরীক্ষা পদ্ধতি আছে যেটা আমি মনে করি অমেধাবীদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে বিসিএসের প্রিলি নেওয়া হয় বেশিরভাগ প্রার্থী বাদ দেওয়ার জন্য। যারা বাদ পড়বে তারা মেধাবী হলে অন্য কোনো জায়গায় ঠিক ব্যবস্থা করতে পারবে। আর বিদেশে যদি চাকরি করতে না পাঠান, পড়তে না পাঠান তাহলে তো নিজ ঘরেই সব মারামারি করে নিজেদের পটেনশিয়াল শেষ হয়ে যাবে।
একুশ শতকে এসে কেউ নিজ দেশেই থাকতে হবে এমন চিন্তা করে না। কানাডার শিক্ষাব্যবস্থা সারা বিশ্বেই খুব প্রশংসনীয়। কানাডার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আমি কখনোই এই মানসিকতা দেখি না যে তাদের কানাডাতেই থাকতে হবে।
আমার জন্ম গ্রামে, তখন আমাদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি ছিল না। তারপর হাইস্কুল পাস করে ঢাকায় কলেজে ভর্তি হলাম, তারপর জাহাঙ্গীরনগর, তারপর ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা, তারপর ওয়েস্টার্ন অন্টারিও। আমার মা–বাবা যদি মনে করতো গ্রামের ভেতরেই তাদের মেয়েকে থাকতে হবে নয়তো গ্রামের ব্রেইন ড্রেইন হবে তবে তো আমার প্রাথমিকেই চাকরি করতে হতো। বুয়েটে পড়া একটি ছাত্রের স্বপ্ন দেখা উচিত গুগলে চাকরি করার। তা না করে তাকে দেশেই পঁচে মরতে হবে।
দেশ দরকার হলে বিদেশে থেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হায়ার করবে। তাতে দেশের সংস্কৃতি বিদেশের কাছে পরিচিত হবে। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান কেন বিদেশি ছাত্রদের স্কলারশিপ দেয়? যাতে করে তাদের পরিচিতি বাড়ে। এসবের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশ ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করে। এসব চিন্তা না করে সেই ছোটবেলায় পড়া “Aim in life” রচনার মতো ডাক্তার গ্রামের মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রজন্ম ধ্বংসকারী পলিসি তৈরি করার কথা বলেছেন।
প্লিজ স্টপ ডুয়িং দিস। প্রতিটি পেশার নিজস্ব মর্যাদা আছে। সেটি রক্ষা করুন। বাচ্চাদের দাতব্য করতে উৎসাহিত করবেন না। দাতব্য প্রতিষ্ঠান কিছু মানুষকে অলস করে তোলে। দাতব্য প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত দাতব্য ব্যক্তির জন্য সবসময় ভালো হয় না। ব্যক্তিগত দাতব্য শুরু করারও একটি স্টেজ থাকে। যার অগাধ অর্থ আছে সেখান থেকে সে কিছু অংশ দিতে পারে। কিন্তু সারাজীবন বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলে তার দুর্দিনে সে নিজে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।
অতএব, লক্ষ্য হোক অর্থনৈতিক মুক্তি, শ্রম এবং মেধার সমন্বয়ে।
লেখকঃ নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
