দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে কার্যত ‘দেউলিয়া পরিস্থিতি’তে পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
সামনে রমজান, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল সব মিলিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিবিসি বাংলা-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখতে হবে। তবে আর্থিক সংকট এতটাই গভীর যে তার ভাষায়, এখন এক ধরনের ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করতে হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অনেক কোম্পানি সাত-আট মাস ধরে বিল পায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি ঘাটতি ও রাজস্ব সংকটের কারণে এ বকেয়া জমেছে। সরকারের কাছ থেকে যে ভর্তুকি পাওয়া যায়, তা দিয়ে পুরো ঘাটতি মেটানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মে তা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা বিদ্যুৎ বিভাগের। দেশে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকট ও অর্থসংকটের কারণে পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, গরম পড়লে লোডশেডিং বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮৮ শতাংশই গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। এর বড় অংশ আমদানি করতে হয়। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতে বছরে ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লাগতে পারে, ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ মোট ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সংগঠন জানিয়েছে, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে এলসি খোলা ও তেল আমদানি কঠিন হবে। এলসি খোলার পর তেল দেশে আসতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। ইতোমধ্যে তেলের মজুদ কমে এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে পিডিবি বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর ওপর চুক্তি অনুযায়ী এলডি বা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে, যা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন উদ্যোক্তারা।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ালে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
তবে ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। চাহিদার শীর্ষ সময়ে তেলভিত্তিক উৎপাদন প্রয়োজন হয়।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, আপাতত রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই অগ্রাধিকার। বকেয়া আংশিক পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো সচল রাখা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া, ভর্তুকি ও জ্বালানি আমদানি এই তিন সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
