লেখক: শাহানা হুদা রঞ্জনা,যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর শপথ নেওয়ার দু’দিন পর সামাজিক মাধ্যমে তার মেয়ে জাইমা রহমান-কে নিয়ে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে তাকে বন্ধুদের সঙ্গে নাচ-গান ও আড্ডায় দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাতা থেকে এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পোস্টগুলোর মন্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে অনেকেই এ ধরনের প্রচারণার সমালোচনা করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল হিসেবে পরিবারের নারী সদস্যদের টার্গেট করা নতুন কিছু নয়। সফল, আলোচিত বা জনপরিসরে দৃশ্যমান নারীদের বিরুদ্ধে পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন বা চরিত্রকে হাতিয়ার বানিয়ে অপপ্রচার চালানোর প্রবণতা বহুদিনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজে নারীবিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
এ ধরনের ঘটনার নজির অতীতেও রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র পরিবারের সদস্য, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর মেয়ে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের পরিবারের সদস্যদের নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে—যদিও তারা সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় নন।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ অস্ত্র। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—যে নেতৃত্বের পরিবার “সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য” নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস গণমাধ্যমে বলেছেন, এ ধরনের প্রচারণা মূলত নেতার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল।
নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বহু আলোচনা হয়েছে। দার্শনিক মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো গ্রিক দার্শনিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘গাইনোফোবিয়া’ বা নারীর প্রতি অযৌক্তিক ভয়কে এর একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নারীবাদী লেখক আন্দ্রেয়া ডোরকিনের মতে, নারীবিদ্বেষ কেবল ব্যক্তিগত ঘৃণা নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার—যার মাধ্যমে নারীকে নিয়ন্ত্রণ ও অবদমিত করা হয়।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার গত কয়েক বছরে বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উত্তরদাতা মনে করেন “মন্দ” মেয়েরা সমাজের জন্য বেশি বিপজ্জনক—যা নারীদের স্বাধীন জীবনযাপন নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতার পেছনে রয়েছে তথাকথিত নৈতিক পুলিশিং, সামাজিক হিংসা, অপ্রাপ্তি এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো মাহিন সুলতান গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু মন্তব্য করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে নারীদের অপমান করা এক ধরনের প্রচলিত কৌশল।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জরুরি। কারণ বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন। ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং নারীর সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদার জন্যও হুমকি।
বিশ্লেষকদের মতে, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, নীতি ও কর্মভিত্তিক সমালোচনাকে প্রাধান্য দিতে হবে। অন্যথায় সামাজিক মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সমাজে আরও গভীর বিভাজন সৃষ্টি করবে।
