বিটিসিএলের সক্ষমতা বাড়াতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া ‘ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। বুয়েটের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যেখানে ২৬ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা যথেষ্ট বলা হয়েছিল, সেখানে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ১৬৫ কোটি টাকায় সম্পন্নযোগ্য প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকায় উন্নীত করার আয়োজন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সমীক্ষা চালায় বুয়েট। প্রতিবেদনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের সম্ভাব্য ব্যান্ডউইথ চাহিদা ২৬ দশমিক ২ টেরাবাইট নির্ধারণ করে ১০০জি লাইন কার্ড স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। তবে সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে চার গুণ বেশি সক্ষমতার যন্ত্রাংশ কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অভিযোগ ওঠার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে প্রকল্পের গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘন, পিপিআর অমান্য, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়চেষ্টা এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। দুদক প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু করলে সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা এবং বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে চীন সফরের জন্য জারি করা সরকারি আদেশ বাতিল করেন এবং তদন্তের উদ্যোগ নেন। পরে তিনি পদত্যাগ করলে দায়িত্ব নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। দায়িত্ব নিয়েই তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপরতা শুরু করেন।
দুদকের অনুসন্ধান চলাকালে ফ্যাক্টরি টেস্ট ছাড়াই চীন থেকে যন্ত্রাংশ আমদানির অভিযোগ রয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান Huawei Technologies-কে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। ব্যাংক ম্যানেজার বিষয়টি নিয়ে দুদকের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে দুদকের তৎকালীন সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলে তা আইনবিরোধী হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়। তবে পরে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দুদক চেয়ারম্যানকে আধাসরকারি চিঠি দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম চালু রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বলেন, অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে এবং শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
হুয়াওয়ের পক্ষ থেকে লিখিত প্রশ্নের জবাব চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দাবি করেছেন, বুয়েট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে যন্ত্রপাতির গুণগতমান পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মাত্র ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে বিটিসিএল, যার অবকাঠামোগত সক্ষমতা ৭ টেরাবাইট। সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে অতিরিক্ত ব্যয় এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এখনো দুদকের অনুসন্ধানে রয়েছে।
