ডিসেম্বর এলেই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ফিরে আসে বিজয়ের স্মৃতি, আত্মত্যাগের ইতিহাস। বিজয় দিবসে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সামরিক কুচকাওয়াজ ছিল সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান প্রতীক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সামরিক শক্তি ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রকাশ। কিন্তু টানা দুই বছর সেই কুচকাওয়াজ বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশজুড়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ দেখিয়ে ২০২৪ সালের বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজ স্থগিত করে। এক বছর পর, ২০২৫ সালেও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বাতিল করা হয়েছে কুচকাওয়াজ।
গত ১৯ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দাবি করেন, বিজয় দিবস ঘিরে অস্থিরতার আশঙ্কা নেই এবং অন্যান্য কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে। তবু সামরিক প্যারেড না করার সিদ্ধান্তে সরকারের যুক্তি স্পষ্ট নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, কুচকাওয়াজ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ। তার ধারণা, কুচকাওয়াজ হলে সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সালাম জানাতে হতো, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত। এই বাস্তবতাও সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হতে পারে।
এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে ঘটে চলা ঘটনাগুলো উদ্বেগ আরও গভীর করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুর, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা এবং মুক্তিযুদ্ধকে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করানোর প্রবণতা নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের ফলক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ চরমে ওঠে। যে ফলকটি ১৯৭২ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু নিজে উদ্বোধন করেছিলেন, সেটি এখন একটি সাদা বোর্ডে পরিণত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক আবু সালেহ রনি বলেন, মিরপুর ছিল ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান স্থান। সেই স্মৃতিচিহ্ন থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা নিছক অবহেলা নয়, বরং ইতিহাস আড়াল করার পরিকল্পিত ইঙ্গিত বলেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে।
এই সব ঘটনার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন, সরকার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নয় এবং তাদের কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পরপর দুই বছর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বাতিল, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা, স্মৃতিচিহ্নে আঘাত—এই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের ১৯৭১-এর ইতিহাস ও চেতনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে।
স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটি আর এড়ানো যাচ্ছে না এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি ৭১-এর ইতিহাস ও চেতনাকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলার একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা?
