নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা ভঙ্গুর হলে একজন আসামির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের সামান্য একটি আশ্বাসবাণীকেও ‘হুমকি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তার প্রমাণ মিললো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে এজলাস থেকে হাজতখানায় নেয়ার পথে “আমরা আছি না স্যার আপনার জন্য” বলার অপরাধে দুই পুলিশ কনস্টেবলকে কেবল প্রত্যাহারই করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কনস্টেবল মো. জামাল হোসেন ও কনস্টেবল মো. সোলাইমান হোসেনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। চিঠিতে দাবি করা হয়, ২৯ এপ্রিল হাসানুল হক ইনুকে আনা-নেয়ার পথে তাদের ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজে ‘শৃঙ্খলা বহির্ভূত’ আচরণ দেখা গেছে, যা বিচারিক কার্যক্রমে হুমকির সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন পুলিশ সদস্যের কাজ কি কেবল আসামিকে বন্দি রাখা, নাকি তার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মৌলিক দায়িত্ব হলো হেফাজতে থাকা যেকোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যখন একজন কনস্টেবল বলেন, “আমরা আছি না স্যার আপনার জন্য”, তখন সেটি একজন বিচলিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ বর্তমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থায় এই মানবিক আচরণকেও ‘অপরাধ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের এক গভীর ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্তের অংশ। যেখানে সামান্য সহমর্মিতাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং ভয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ডকে কুক্ষিগত করে রাখা হয়।
আসামির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যখন রক্ষককেই ভক্ষকের রোষানলে পড়তে হয়, তখন বুঝে নিতে হবে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বৈষম্য জেঁকে বসেছে। এই ধরণের কঠোর ও একপাক্ষিক ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক কারও ন্যূনতম মানবিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই।
রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রের এই দমবন্ধ করা ও বৈষম্যমূলক বন্দোবস্ত কোনো স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। আজ পুলিশের দুই কনস্টেবল যেভাবে বলির পাঁঠা হলেন, কাল যে কেউ এই প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন। তাই সময় এসেছে এই ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। এই অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেই কেবল একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব।
