নিজস্ব প্রতিনিধি
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা সেই ঐতিহাসিক ‘খালকাটা কর্মসূচি’র আদলে দেশব্যাপী নতুন করে কর্মসূচি শুরু করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সরকার যে ব্যাপক নদী ও খাল খনন প্রকল্প (যেমন: ডেল্টা প্ল্যান ২১০০) বাস্তবায়ন করেছে। তারেক রহমান কি সেই কর্মসূচিরই নতুন রূপ দিতে চাইছেন? নাকি জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের মুখে নিজের কর্মসূচিকেই ঝুঁকিতে ফেলছেন
ঝালকাঠিতে সাতটি খাল খননে যে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। তাতে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা—তারেক রহমান যে খাল কাটছেন, সেই খালেই হয়তো ‘কুমির’ হয়ে দাপিয়ে বেড়াবেন তার দলের নেতাকর্মীরা। ৫ই আগস্টের পর থেকে সারা দেশে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর যে দখলদারিত্বের চিত্র দেখা গেছে। তার ধারাবাহিকতায় এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত নেতাদের ‘ভাগ-বাটোয়ারা’র হাতিয়ারে পরিণত হয় কি না। তা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঝালকাঠি পৌর এলাকায় সাতটি খাল খননের কাজ সময়মতো শেষ না করে উল্টো পৌরসভার ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগে ‘আজমির বিল্ডার্স লি.’ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) টি.এম. রেজাউল হক রিজভী জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে সাতটি খাল খননের কাজ দেওয়া হলেও ঠিকাদার ছয়টি খালের কাজ আংশিক করে ফেলে রেখেছে। একটি খালের কাজ শুরুই হয়নি। বারবার তাগাদা দিলেও কোনো কাজ হয়নি। যার ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার এই প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদার ইতিমধ্যে ৫২ লাখ ৭১ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন। অথচ কাজ শেষ না করেই তিনি চূড়ান্ত বিলের জন্য বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে পৌরসভাকে চাপ দিচ্ছেন এবং হুমকি প্রদান করছেন। এই ‘প্রভাবশালী মহল’ আসলে কারা—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কানাঘুষা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নতুন ‘কুমির’রা এখন এসব প্রকল্পে হানা দিচ্ছে।
গুগল ও উন্নয়ন রেকর্ড যাচাই করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার আমলে দেশব্যাপী নদী ও খাল খননে বিশাল বাজেট বরাদ্দ ছিল। বিশেষ করে ‘৬৪ জেলায় ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনর্খনন’ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। তারেক রহমান এখন যখন সেই একই কর্মসূচি নতুন করে শুরু করেছেন, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এখানে স্বচ্ছতা থাকবে। কিন্তু ঝালকাঠির ঘটনা বলছে ভিন্ন কথা।
ঠিকাদার মো. সরোয়ার হোসেন এই নোটিশকে অযৌক্তিক দাবি করলেও পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থানে অনড়। প্রকৌশলী রিজভী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৩ দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে।
তারেক রহমান যে মহৎ উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচি শুরু করুন না কেন, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এটি শেখ হাসিনার আমলের দুর্নীতির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ঝালকাঠির এই উদাহরণ যেন তারই আগাম সতর্কবার্তা। বিএনপি যদি দখলদারিত্ব ও অনিয়ম বন্ধ করতে না পারে, তবে এই খালকাটা কর্মসূচি জনকল্যাণের বদলে দলীয় নেতাদের ব্যক্তিগত আখের গোছানোর আরেকটি ‘আশ্চর্য প্রদীপে’ পরিণত হবে।
