নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্নেল তাহেরের ভাই আনোয়ার হোসেন স্যারকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। স্যার জাহাঙ্গীরনগরের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এখানে বৃষ্টির দিনে কদম ফোটে, ছাতিম ঘ্রাণ ছড়ায় কয়েক মাইল, চাপালিসের ডালে ছোট ছোট কাঁঠালের মতো চাপালিস ঝুলতে থাকে, কৃষ্ণচূড়ার ডালে আগুন লাগে, শিমুল পলাশের কমলা এবং লাল রঙে রঙিন ডালে কোকিল ডাকে, বেগুনি জারুল আর দীঘির লাল শাপলা দেখে অতি ব্যস্ত পথিকও কাজ ভুলে বেঞ্চিতে বসে থাকে। আর আনোয়ার স্যার হলেন প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলা অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি।
আনোয়ার স্যার প্রতিদিন সকাল বিকেল হাঁটতে বের হোন। জাবির ৭০০ একর ভূমির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সকাল বিকেল ছুটে চলেন। সাথে তাঁর পারিষদও থাকেন তাঁকে বিভিন্ন কাজে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। আনোয়ার স্যার লক্ষ্য করলেন সকাল বিকেল হাঁটতে গেলে তাঁকে বেশ বেগ পোহাতে হয়। কারণ জাবির ভূমি সমতল নয়, বরং টিলা প্রকৃতির। একটা জায়গায় উঁচু তো অপর জায়গা নিচু। আবার বিভিন্ন জায়গায় নিচু জলাভূমি যেখানে ধানচাষ হয়।
আনোয়ার স্যার মনে করলেন এমন তো হতে পারে না। নিশ্চয়ই জাবির লেক ভরাট হয়ে জলাভূমি হয়ে গেছে। এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য, সুশোভিত লাল শাপলার বিল মাটিতে ভরাট হয়ে যাবে! সেটি হবে না। তিনি উদ্যোগ নিলেন লেক সংস্কারের। উল্লেখ্য তখনো ছেলেমেয়েরা গণরুমে গাদাগাদি করে বসবাস করে, ছাত্রদের জন্য কোন একাডেমিক ভবনে পড়ার জায়গা নেই, বৃষ্টি হলে কোরিডোর ছাড়া দাঁড়ানোর জায়গা নেই, শিক্ষকদের সকলের জন্য অফিস নেই, ক্লাসরুমের সংকট, নেই সকল শিক্ষকের জন্য কম্পিউটার।
কিন্তু স্যারের কাছে মনে হলো জাবির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের উপর সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) এর প্রজেক্ট এনে লেক সংস্কারের কাজ শুরু করলেন। জাবির যত নিচু জমি ছিল সব কেটে লেক, পুকুর, ডোবা বানিয়ে ফেললেন। ফলে জাবির যে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ছিল সেটি কিছুটা কৃত্রিম হয়ে কিছুক্ষণ পরপর জলাধারের সমন্বয়ে গঠিত এক ভূখন্ডে রূপ নিল। চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠতে থাকলো। কিছুদিন পর নানাবিধ কারনেই তাঁকে ভিসি পদের ইস্তফা দিয়ে ঢাবিতে ফেরত যেতে হলো।
সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এত বড় একটা প্রজেক্ট সরকার যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা না করেই শুরু করে দিলো। ২০২৬ সালে খালের ভূমিকা কী, কোন কোন জায়গায় এই খাল হলে ভালো হয়, আদৌ দরকার আছে কিনা, আধুনিক নগর পরিকল্পনা, কত শতাংশ জনগোষ্ঠী এর দ্বারা উপকৃত হবে, কোন পদ্ধতিতে সবচেয়ে কম খরচে কাজটি করা সম্ভব, এই প্রকল্পে মোট বরাদ্দ কত, বাস্তবায়নের ফলে খরচের টাকা কত দিনে উঠে আসা সম্ভব, আদৌ লাভজনক হবে কিনা ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কাজটি শুরু করা দরকার ছিল।
বর্তমান বাংলাদেশে কৃষি জমির পরিমাণ কত শতাংশ? কত শতাংশ জনগোষ্ঠী কৃষির উপর নির্ভরশীল? খাল খননের ফলে আবাদি জমি বা বসতি জমির পরিমাণ কমে যাবে কিনা সেগুলো যাচাই করতে কমপক্ষে ১ বছর সময় লাগার কথা। তাছাড়া যে কোন ভূমিরূপ তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়াটাই উচিত। এখন সড়ক পথের এতো উন্নতি হয়েছে যে কেউ নদীপথে ভ্রমণ করতে চায় না, সেচ প্রকল্পের জন্য ডিপ টিউবওয়েল রয়েছে, আছে ইলেকট্রিসিটির ব্যবহার, গ্রামের লোকজনও এখন গোসলের জন্য বাথরুম ব্যবহার করে, নদীপথে পন্য পরিবহনের পরিবর্তে সড়কপথে দ্রুত সময়ে পন্য পরিবহনে লোকজন অভ্যস্ত।
সুতরাং, এই খাল কাটার পর তা কেবল কুমিরের উপদ্রব বাড়াবে কিনা সরকার নতুন করে ভেবে দেখতে পারে। যদিও এতে কিছু স্থানীয় নেতার আয় রোজগারের কিছু ব্যবস্থা হতে পারে, খাল কেটে কুমির আনার চেয়ে খাল না কাটা ভালো।
