নিজস্ব প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা আর নোবেলজয়ী পরিচয়—সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি প্রতিশ্রুতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশার বাস্তবায়ন তো হয়ইনি, বরং ড. ইউনূসের ‘অদক্ষ হটকারিতা’ ও কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। কমার বদলে ইউনুস সরকারের আমলে এক বছরে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ।
সেই বহুল আলোচিত ‘ঈদের প্রতিশ্রুতি’
গত বছর (১৪ মার্চ, ২০২৫) কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরে ইফতারে অংশ নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করেছিলেন, “রোহিঙ্গারা আগামী বছর যেন নিজ বাড়িতে (মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে) ঈদ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে কাজ করা হবে।” এমনকি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বক্তব্য দিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, সামনের ঈদ তারা নিজ ভূমিতেই করবেন।
১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। তখন দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের সেই অপেক্ষা শেষ হয়নি। কাঁটাতারের বেষ্টনীতে বন্দি জীবনে এবারের ঈদও কাটবে তাদের।
রোহিঙ্গা কমেনি, বেড়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রধান উপদেষ্টার মেয়াদের এক চরম ব্যর্থতা ফুটিয়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেখানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ছিল ১০ লাখ ৬ হাজার ১০৭ জন, ২০২৬ সালের একই সময়ে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে রোহিঙ্গা বেড়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৫৭ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষায় অদক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণেই নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা গত এক বছরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এছাড়া ক্যাম্পে জন্ম নিয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার শিশু। অথচ প্রত্যাবাসন বা সংখ্যা কমানোর কোনো কার্যকর পথ দেখাতে পারেনি বিদায়ী সরকার।
আবেগ নাকি সস্তা জনপ্রিয়তা?
রোহিঙ্গা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দীন এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করেছেন ভিন্নভাবে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ড. ইউনূসের সেই বক্তব্য কি কেবলই আবেগ ছিল, নাকি ‘মিডিয়া সেনসেশন’ তৈরির চেষ্টা? তিনি বলেন, “নোবেল লরিয়েট হিসেবে এক বছরে সব ঠিক করে ফেলবেন—এমন একটি ইমেজ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল, যা বাস্তবসম্মত ছিল না।”
অন্যদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, রাখাইনের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কোনো কার্যকর রোডম্যাপ ছাড়াই এমন আশ্বাস দেওয়া ছিল এক ধরনের ‘হটকারিতা’।
সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বিষয়টিকে ‘কমিটমেন্ট’ নয় বরং ‘উইশ’ বা প্রত্যাশা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রের প্রধান যখন একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেন, তখন তা আন্তর্জাতিক মহলে দায়বদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু ড. ইউনূসের আমলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের চেয়ে বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ইস্যুটি ‘অগ্রাধিকারের তালিকা’ থেকে নিচে নেমে গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ৪৫ বছর বয়সী আবদুস সালাম আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবার হয়তো ফিরব। এখন বুঝি, ওটা শুধু কথাই ছিল।” মানবাধিকার কর্মীদের মতে, রোহিঙ্গারা এখন ভূ-রাজনীতির অনাথ। একদিকে ত্রাণের ঘাটতি, অন্যদিকে প্রত্যাবাসন নিয়ে ধোঁয়াশা—সব মিলিয়ে ড. ইউনূসের মেয়াদে রোহিঙ্গা সংকট কেবল দীর্ঘায়িতই হয়নি, সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
