বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যৌথ চিঠি পাঠিয়েছে বিশ্বের নয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই পাঠানো এই চিঠি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ ও আইন মন্ত্রী আসাদুজ্জামনকেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। এতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ঊনিশ, সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটি, সিভিকাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশন, ফোরটিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ কেনেডি মানবাধিকার এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।
সংগঠনগুলো বলেছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা ভেঙে বাস্তব সংস্কার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
চিঠিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন এবং তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে রূপ দিতে না পারলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
গুম ও ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অতীতে অন্তত এক হাজার পাঁচশ ঊনসত্তর জন গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে এখনো দুই শতাধিক নিখোঁজ। এছাড়া গণআন্দোলনের সময় বহু মানুষের মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনার বিচার না হলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নানা চাপ, হুমকি ও মামলার মুখে রয়েছে। এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশসংক্রান্ত মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আইনের অপব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা, দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক এবং কঠোর আইনের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব মামলার পর্যালোচনার জন্য স্বাধীন কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা খাতে সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিতর্কিত কার্যক্রম বন্ধ করা এবং স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের শিবিরে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শিক্ষা, জীবিকা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে।
চিঠির শেষাংশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হলেও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর তাদের নজরদারি অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিঠি নতুন সরকারের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা—বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে রয়েছে।
