শান্তিতে নোবেল পুরস্কার সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। অন্যান্য বিষয়ে বিজয়ীদের অবদান স্পষ্ট হলেও শান্তিতে সেটা খুবই কম হয়ে থাকে। বিজয়ীদের অবদান সবসময় বিতর্কের জন্ম দেয়। এই পুরস্কার বিজয়ীকে মহিমান্বিত করলেও তার অবদান মানুষের জন্য কি করেছে সেই সমালোচনা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। যেমন মালালা, অং সান সুচি কিংবা ড. ইউনুসের নাম উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অর্থনীতিবিদ হয়ে তিনি জিতলেন শান্তিতে নোবেল। শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অবদান সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর মৌলবাদের উত্থান এবং পশ্চিমা স্বার্থ উদ্ধার যেন তার নোবেল জয়কে কলঙ্কিত করে। আবার য়ানমারের অং সান সুচি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রোহিঙ্গাদের উপর গনহত্যা চালানো হয় যা তার শান্তিতে নোবেল জয়কে বিতর্কিত করে তোলে। নিচে আরো অনেক শান্তিতে নোবেলজয়ীর বিতর্কিত জীবন এবং করুণ পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
নোবেল শান্তি পুরস্কার যেন মানবতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানের মুকুট। যারা যুদ্ধ থামাতে, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে বা নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়াতে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন, তাদেরকে এই সম্মান দেওয়া হয়। কিন্তু, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় শান্তির পথের পথিকদের শেষ পরিণতি সবসময় শান্ত ছিল না। বরং কখনো তা রক্তাক্ত, কখনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে ঘেরা, কখনো একাকী ও অবহেলিত। যেন মানবতার জন্য লড়াই করাই তাদের ব্যক্তিগত জীবনে এনে দিয়েছে অস্থিরতা ও ঝড়। তেমনই কয়েকজনের কথা তুলে ধরছি-
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র
১৯৬৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় মুখ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে তার জীবন দিতে হয় ঘৃণা ও সহিংসতার কাছে। বর্ণবৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখানো এই মানুষটিকে ১৯৬৮ সালে মেমফিসে গুলিতে হত্যা করা হয়। শান্তির বার্তাবাহকের এমন নির্মম পরিণতি যেন পুরো মানবজাতিকে প্রশ্ন করে—সহিংসতার শিকার সবচেয়ে বেশি কেন শান্তির সৈনিকরাই হন?
আন্দ্রেই সাখারভ
১৯৭৫ সালের শান্তিতে নোবেলজয়ী সোভিয়েত পদার্থবিদ ও মানবাধিকারকর্মী আন্দ্রেই সাখারভ ছিলেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের কণ্ঠশত্রু। তার পুরস্কারের পরই তাকে নির্বাসন ও গৃহবন্দি করা হয়, যোগাযোগ সীমিত করা হয়, বছরের পর বছর বিচ্ছিন্নতায় কাটাতে হয়। শান্তির জন্য লড়াই তাকে রাষ্ট্রের চোখে শত্রুতে পরিণত করেছিল। জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত তাকে লড়তে হয়েছে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য। যে লড়াই তাকে ভেঙে দিয়েছিল শারীরিকভাবে, কিন্তু নত করতে পারেনি নৈতিকভাবে।
দাগ হামারশোল্ড
জাতিসংঘের মহাসচিব দাগ হামারশোল্ড ১৯৬১ সালে আফ্রিকায় যুদ্ধবিরতির মিশনে গিয়ে বিমানে নিহত হন। পরবর্তীতে তিনি মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তার মৃত্যু রহস্যময়; অনেকে বিশ্বাস করেন, শান্তি স্থাপনে তার দৃঢ় ভূমিকা শক্তিশালী কিছু আন্তর্জাতিক স্বার্থগোষ্ঠীকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। শান্তির মিশনে জীবন বিসর্জনের এই ঘটনা বিশ্ব কূটনীতিতে চিরস্থায়ী ট্র্যাজেডি হয়ে আছে।
অং সান সুচি
২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি ছিলেন গণতন্ত্রের আইকন। কিন্তু, পরে রোহিঙ্গা সংকটে তার ভূমিকা ও নীরবতা বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিগত নিপীড়ন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় তার নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শান্তিতে নোবেল পাওয়া সত্ত্বেও জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন।
ইৎসহাক রবিন
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎসহাক রবিন, যিনি ১৯৯৪ সালে শান্তিতে নোবেল পান। নিজের দেশের একজন চরমপন্থীর হাতে তিনি নিহত হন। আরব-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি মানুষকে শান্তির বার্তা দিলেও তাকে দিল মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম পরিণতি। শান্তির জন্য এগিয়ে যাওয়া আগুনের মধ্য দিয়ে হাঁটার মতোই বিপজ্জনক।রবিনের মৃত্যু তারই প্রমাণ।
লিউ শিয়াবো
চীনা লেখক ও মানবাধিকারকর্মী লিউ শিয়াবো ২০১০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, কিন্তু তখনও তিনি ছিলেন কারাগারে। অসুস্থ অবস্থায় আটক থাকার সময়ই তার মৃত্যু হয়। শান্তির পুরস্কার তাকে বাঁচাতে পারেনি রাষ্ট্রের কঠোর দমননীতি থেকে।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তরা নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যুদ্ধ থামানোর আহ্বান কিংবা মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করেছেন। কিন্তু তাদের শেষ পরিণতি প্রমাণ করে—শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কখনোই শান্ত নয়।
কেউ হয়েছেন হত্যার শিকার, কেউ নির্বাসিত, কেউ বন্দি, কেউ আবার অবহেলা ও দুঃখের ভাঁজে হারিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে শান্তির জন্য যারা সবচেয়ে বেশি লড়েন, তাদের জীবনই হয় সবচেয়ে অশান্ত। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কার কপালে কি আছে সেটা একমাত্র উপরওয়ালাই বলতে পারেন।
