নোবেল পুরস্কার মানবসভ্যতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতিগুলোর একটি। বিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি কিংবা মানবকল্যাণে অসাধারণ অবদান রাখার পরই কেউ এই সম্মান পাওয়ার যোগ্য হন। অথচ এই বিশ্বনন্দিত মানুষগুলোর অনেকেই জীবনের শেষভাগে করুণ, একাকী বা বেদনাদায়ক পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন। যেন মহৎ অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মানসিক যন্ত্রণা, রোগবালাই কিংবা সামাজিক অবমাননার অন্ধকার গল্প। ইতিহাসের পাতা খুলে তাদের জীবন দেখলে বোঝা যায় গৌরবের চূড়ায় উঠলেও মানুষ প্রকৃতির নির্মমতা থেকে রেহাই পায় না।
প্রথমেই মনে আসে দুইবার নোবেলজয়ী মেরি কুরির নাম। তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তখনো বিশ্ব যথেষ্ট অবগত ছিল না। গবেষণাগারে রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের মতো উচ্চ তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করেছিলেন কোনো সুরক্ষা ছাড়া। ফলস্বরূপ, জীবনের শেষভাগে তিনি অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হন, এবং সেই রোগই তার মৃত্যুর কারণ হয়। যে আবিষ্কার তাকে বিশ্বজোড়া সম্মান এনে দিয়েছিল, সেটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। এ যেন বিজ্ঞানীর নিজের অর্জনই তার করুণ ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল।
একইভাবে করুণ পরিণতি বরণ করেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ১৯৫৪ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এই কিংবদন্তির লেখক জীবনের শেষ বছরগুলোতে ভুগেছেন তীব্র বিষন্নতায়। খ্যাতি, সম্পদ বা শ্রদ্ধার পাল্লা যতই ভারী হোক, তার মনের অন্ধকারকে আলো দিতে পারেনি কিছুই। মানসিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে ইলেকট্রিক শক থেরাপি নিতে হয়, যা তার সৃজনশীলতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দুকের গুলি দিয়ে নিজের জীবন শেষ করেন। নোবেলজয়ী এক মহীরুহের এমন আত্মহনন মানব মানসের অন্তহীন যন্ত্রণার এক ভয়াবহ দলিল।
বিজ্ঞানী ফ্রিটজ হ্যাবারের জীবনও একইসঙ্গে গৌরব ও ট্র্যাজেডির মিশেল। অ্যামোনিয়া উৎপাদনের পদ্ধতি আবিষ্কার করে তিনি বিশ্বকে খাদ্য সংকট থেকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জনক হিসেবে তার নামে ইতিহাসের পাতায় কলঙ্ক লেগে যায়। নিজের কাজের নৈতিক দিক নিয়ে দ্বন্দ্ব, স্ত্রীর আত্মহত্যা এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি পরিণত হন এক নিঃসঙ্গ ভগ্নহৃদয় মানুষে। জীবনের শেষভাগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একাকী দিন কাটান।
এমনই আরেক বেদনাদায়ক পরিণতি দেখা যায় সিনক্লেয়ার লুইস-এর জীবনে। ১৯৩০ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া প্রথম মার্কিন লেখক তিনি। সাহিত্যকীর্তিতে সম্মান পেলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি অ্যালকোহল আসক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। খ্যাতির শীর্ষ ছুঁয়েও জীবনের শেষভাগ কাটান একাকী, অসুস্থ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায়। অবশেষে মদ্যপানজনিত শারীরিক জটিলতায় তার মৃত্যু ঘটে।
অনুরূপভাবে, নোবেল বিজয়ী সুইডিশ কবি হ্যারি মার্টিনসনের শেষ অধ্যায়টিও অত্যন্ত করুণ। নোবেল পাওয়ার পর তিনি প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। অনেকে দাবি করেন, তিনি নিজেই নোবেল কমিটির সদস্য হওয়ায় তার পুরস্কারটা ন্যায্য নয়। এ অপমান ও মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। জীবনের শেষ শ্বাস পর্যন্ত তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, মানুষের মানসিক আঘাত কখনো কখনো যেকোনো শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও ভয়ংকর।
এই সব গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় নোবেল বিজয়ীরা অতিমানব নন; তারাও আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ, যাদের জীবনে থাকে ব্যক্তিগত সংকট, যন্ত্রণা এবং অস্তিত্বের টানাপোড়ন। তাদের সাফল্য যতই উজ্জ্বল হোক, জীবনের অন্ধকার কখনো কখনো তাদের ওপরও ছায়া ফেলে। মানব কল্যাণে তারা সৃষ্টি করেছেন আলো, কিন্তু প্রায়ই সেই আলোর আড়ালেই লুকিয়ে ছিল তাদের নিজেদের অন্ধকার ভাগ্য।
শেষ পর্যন্ত নোবেল বিজয়ীদের এই করুণ পরিণতি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে শেখায় যে, গৌরবের শীর্ষে উঠলেও জীবনের ট্র্যাজেডি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। অর্জনের চূড়া কখনো কখনো এক ভয়ংকর নিঃসঙ্গতারও নাম হতে পারে।
