লেখকঃ মহিউদ্দিন শামীম
গরুর মাংস খাওয়া ইসলামে বৈধ। কিন্তু সেই বৈধতাকে কি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার, উপাসনালয়ের সামনে উসকানিমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার কিংবা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে গায়ের জোর প্রদর্শনের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
পবিত্র কুরআনের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
আমার কাছে বিষয়টি নিছক গরু জবাই কিংবা ভোজের আয়োজন নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোথায়, কখন, কী পরিস্থিতিতে এবং কী উদ্দেশ্যে কাজটি করা হলো।
আমার জানা ও প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা চলাকালে একটি মন্দিরের সামনে গরু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্নাবান্না ও ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। বিষয়টি আগে থেকেই ঘোষিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের ওই স্থানে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল এবং নিষেধ করেছিল। তা সত্ত্বেও যদি সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে গায়ের জোরে কাজটি করা হয়ে থাকে, তাহলে এর নৈতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আমি এখানে কোনো ধর্মের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা অস্বীকার করছি না। বরং প্রশ্ন করছি, নিজের ধর্ম পালনের অধিকার কি অন্যের ধর্মীয় মর্যাদাকে আঘাত করার অধিকারও দিয়ে দেয়?
পবিত্র কুরআনের শিক্ষা কী?
১. অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান ও উসকানির হাতিয়ার বানানো কুরআনের শিক্ষা নয়।
আল্লাহ বলেন:
“তোমরা তাদের উপাস্যদের গালি দিও না, তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত শত্রুতা করে আল্লাহকে গালি দেবে।”
— সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থেকেও অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান ও সংঘাতের উপলক্ষ বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
অতএব, কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের উপাসনালয়ের সামনে গরু জবাই করা হলে, সেটিকে নিছক খাদ্য গ্রহণের ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এমন আচরণ কুরআনের এই আয়াতে প্রকাশিত সংযম ও উসকানি পরিহারের নীতির পরিপন্থী।
১. অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নেও কুরআন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
“আল্লাহ যদি মানুষের একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ, যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়।”
— সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৪০
এই আয়াতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের উল্লেখ রয়েছে।
কুরআন যখন বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের অস্তিত্ব রক্ষার কথা তুলে ধরে, তখন অন্যের উপাসনালয়ের সামনে গায়ের জোর প্রদর্শন, ধর্মীয় উৎসবকে অপমানের উপলক্ষ বানানো কিংবা সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করার আচরণকে কীভাবে কুরআনিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়?
১. ধর্মীয় পরিচয় কাউকে অন্যায় করার অধিকার দেয় না।
আল্লাহ বলেন:
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করার জন্য প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
— সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮
এই আয়াতের শিক্ষা শুধু অন্যের প্রতি বিদ্বেষের ক্ষেত্রেই নয়, নিজের সম্প্রদায়ের অন্যায়কে বিচার করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ মুসলমান হলেই তাঁর প্রতিটি কাজ ইসলামসম্মত হয়ে যায় না। কেউ ইসলামের নাম ব্যবহার করলেই তাঁর আচরণ পবিত্র কুরআনের নৈতিকতার প্রতিনিধিত্ব করে না।
বরং মুসলমানের কাজকেও কুরআনের ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।
১. গায়ের জোর ও সীমালঙ্ঘন কখনো ধার্মিকতার প্রমাণ নয়।
আল্লাহ বলেন:
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।”
— সূরা আল-মায়িদা, ৫:২
বিশ্ববিদ্যালয় একটি যৌথ শিক্ষাঙ্গন। সেখানে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশ অন্যায্য হলে তা প্রশ্ন করা, যুক্তি দেওয়া কিংবা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো নির্দেশ অপছন্দ হলেই গায়ের জোরে তা অমান্য করা এবং অন্যের ধর্মীয় উৎসবের সময় উপাসনালয়ের সামনে এমন কাজ করা, যা উত্তেজনা ও সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে, তাকে ধর্মীয় অধিকার চর্চার সরল উদাহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
১. আনুগত্যের প্রশ্নেও কুরআন আমাদের দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করো।”
— সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯
এই আয়াতকে কোনো কর্তৃপক্ষের প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে এর আলোকে এটুকু বলা যায়, সামাজিক শৃঙ্খলা ও মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশকে নিছক গায়ের জোরে উপেক্ষা করাকে ধর্মীয় বীরত্ব হিসেবে প্রচার করা যায় না।
১. ধর্মের নামে উগ্রতা কি ধর্মের মর্যাদা বাড়ায়, নাকি ক্ষুণ্ন করে?
এখানেই আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইসলাম যদি ন্যায়বিচার, সংযম, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়, তাহলে সেই ইসলামের নাম নিয়ে যদি কেউ অন্যের ধর্মীয় উৎসবের সময় উপাসনালয়ের সামনে উসকানিমূলক আচরণ করে, তবে তার কাজকে ইসলামের শিক্ষা দিয়ে সমর্থন করা হবে কেন?
ইসলামের নামে করা কোনো কাজকে ইসলামসম্মত প্রমাণ করার দায়িত্ব সেই কাজের সমর্থকদেরই নিতে হবে। শুধু ধর্মীয় পরিচয় কিংবা স্লোগান কোনো কাজকে নৈতিক বৈধতা দেয় না।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি:
আমি বলছি না যে গরু জবাই করা বা গরুর মাংস খাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। আমি বলছি না যে অন্য ধর্মের মানুষ কী খাবে বা কীভাবে ধর্ম পালন করবে, তা মুসলমানদের ঠিক করে দেওয়ার অধিকার আছে।
আমি বলছি, খাদ্যের বৈধতা আর সেই খাদ্যকে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।
কোনো কাজের উদ্দেশ্য নির্ধারণে প্রমাণ জরুরি। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে ধর্মীয় উৎসবের সময় ও স্থান বেছে নেওয়া হয়েছে অন্য সম্প্রদায়কে অপমান বা উসকানি দেওয়ার জন্য, তাহলে সেই আচরণের সমালোচনা করা ধর্মবিদ্বেষ নয়; বরং কুরআনের ন্যায়বিচার ও সংযমের শিক্ষার আলোকে তার মূল্যায়ন।
একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভঙ্গ বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগের বিচারও প্রমাণ, প্রযোজ্য আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
আমার বক্তব্যের সারকথা
আমি মুসলমানের ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে, হিন্দুর ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষেও। আমি সবার সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের পক্ষে।
আমি চাই, ইসলামকে বিচার করা হোক পবিত্র কুরআনের শিক্ষা দিয়ে—কোনো উগ্র গোষ্ঠীর আচরণ দিয়ে নয়।
ইসলামের নামে এমন কোনো আচরণকে সমর্থন করা যায় না, যা কুরআনের ন্যায়বিচার, সংযম ও অন্যের ধর্মীয় মর্যাদার প্রতি সম্মানের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ধর্ম মানুষের বিবেককে উন্নত করার কথা; অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করার অস্ত্র হওয়ার কথা নয়।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি দিয়ে সংখ্যালঘুর ধর্মীয় মর্যাদাকে আঘাত করা কোনো নৈতিক বিজয় নয়। আর গায়ের জোর কখনো সত্যের প্রমাণ নয়।
আমরা যদি সত্যিই কুরআনের অনুসারী হওয়ার দাবি করি, তাহলে অন্যের প্রতি আমাদের আচরণেও কুরআনের ন্যায়বিচার, সংযম ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন থাকতে হবে।
ধর্মের নামে উগ্রতা নয়—মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠিত হোক।
পবিত্র কুরআনের আলোয় ধর্মকে বুঝি; ধর্মের নাম ব্যবহার করে অন্যায়কে বৈধতা না দিই।
