ফোরটিন ডেস্ক : টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষকে ক্ষুব্ধ জনতার চড় মারার ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে গোটা দেশ। এতদিন লোকলজ্জা আর কথিত ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে যেসব অন্ধকার ঘটনা চার দেয়ালের ভেতর সালিসের নামে ধামাচাপা দেওয়া হতো, তা এখন একের পর এক প্রকাশ্যে আসছে। টঙ্গী থেকে পাবনা—গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক ও পরিচালকদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দেখা গেছে সাধারণ মানুষের তীব্র ও চরম প্রতিক্রিয়া।
টঙ্গীর আউচপাড়ায় প্রথম শ্রেণির সাত বছরের এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে উপাধ্যক্ষকে মারধরের সেই ভিডিওর পর পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নেয়। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে উল্টো ভুক্তভোগীর পরিবারের বিরুদ্ধেই ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে পাল্টা মামলা ঠুকে দিয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
একই সময়ে গাজীপুরের গাছায় আট বছরের এক শিশুকে স্টোররুমে আটকে রেখে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক ও পরিচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নয় বছরের শিশুকে নিপীড়নের ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘আপস’ করার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মামলা করেছেন শিশুর মা। এর আগে সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষককে ধরতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ওসিসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে পাবনা সদরে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে স্থানীয়রা মাদ্রাসা ও শিক্ষকের বাড়িতে সরাসরি আগুন ধরিয়ে দেয়।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাদ্রাসায় অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। বাস্তবে এই সংখ্যা বহুগুণ বেশি। এতদিন এই ধরনের অপরাধ সামনে এলে ‘ধর্মের ওপর আঘাত’ তকমা দিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাধারণ অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ এবার বাঁধভাঙা রূপ নিচ্ছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অভিভাবকরা যেভাবে মুখ খুলছেন এবং মামলা করছেন, তা ইতিবাচক হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছে। গণপিটুনি বা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ অপরাধের সঠিক বিচারকে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে আইন ভাঙলে ভুক্তভোগী পরিবার নিজেই আইনি ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে, যার প্রমাণ টঙ্গীর পাল্টা মামলা। তাই জনতার বিচার নয়, বরং তদন্ত দ্রুত শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
