নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময়ের প্রাণবন্ত আড্ডা, পড়াশোনা আর জাতীয় দিবসের নানা আয়োজনে মুখর থাকা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘চেতনা-৭১’ এখন চরম অবহেলা আর ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভাস্কর্যটি সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উল্টো শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে মেরামতের চেষ্টা প্রশাসনের অনুমতি ও সিদ্ধান্তের মারপ্যাঁচে আটকে যায়।
সম্প্রতি দেখা যায়, জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের প্রতিকৃতির মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে গেছে। ছাত্র ও ছাত্রীর প্রতিকৃতির পেছনের অংশ এবং পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বেদি থেকে তুলে ফেলা হয়েছে ‘চেতনা-৭১’ লেখা নামফলকটি। দীর্ঘদিন পরিচর্যা না থাকায় প্রতিকৃতিগুলোতে শ্যাওলা জমে কালচে দাগ পড়েছে এবং চারপাশের মেঝে রয়েছে অপরিচ্ছন্ন।
নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মধ্যরাতে অস্ত্রধারী একদল দুর্বৃত্ত পেছনের ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ভাস্কর্যটি ভাঙচুর চালায়। এটি সিলেট অঞ্চলের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য।
ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের পর বসে থাকেননি শিক্ষার্থীরা। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের অন্তিক চৌধুরী এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের স্থাপত্য বিভাগের মুহতাসিম ফিরদাউস মাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন।
ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী নারায়ণগঞ্জের ‘নৃ স্কুল অব স্কাল্পচার’-এর প্রতিষ্ঠাতা মোবারক হোসেন নৃপালকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মেরামতের সামগ্রী কেনানো হয় এবং মোল্ড প্রস্তুত রাখা হয়। কিন্তু তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলের বন্যা এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অনুমতি বা সাড়া না পাওয়ায় পাঁচ-ছয় মাস অপেক্ষা করে সেই মোল্ড নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের কাছে অবশিষ্টাংশ হিসেবে আট হাজার টাকা জমা রয়েছে, যা তারা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করতে চান।
শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল জানান, প্রশাসনের অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তিনি নিজ দায়িত্বে আগের আদলে ভাস্কর্যটি ফিরিয়ে দিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিকড়ের’ সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, গত দুই বছরে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, নতুন প্রশাসন এসেছে; অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই ভাস্কর্য আজও দেশবিরোধী শক্তির দেওয়া ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
ভাস্কর্যটি সংস্কারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনার অংশ। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটি সংস্কার করা দরকার এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে শিগগিরই সমাধান করার চেষ্টা করব।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নানা সমস্যার পাশাপাশি এই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে তারা ধাপে ধাপে কাজ করছেন।
শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী এই ঐতিহাসিক স্মারকটি দ্রুত যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংস্কার করা হোক, যাতে ক্যাম্পাস তার ঐতিহ্যবাহী আবহ ফিরে পায়।
