নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পদ্মপুকুর গ্রামের ‘রওজাতুল জান্নাত বালিকা হাফেজিয়া মাদ্রাসা’র আবাসিক শাখায় দুই এতিম জমজ বোনকে (১১) চরম যৌন নিপীড়নের এক ন্যাক্কারজনক ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর মাদ্রাসার পরিচালক এবং বায়তুল আকসা জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মো. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে। পবিত্র ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে এতিম ও অসহায় শিশুদের ওপর এমন পাশবিক মানসিকতার প্রকাশে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণ।
ভুক্তভোগী শিশু দুটির বাবা পরলোকে এবং তাদের মা পরবর্তীতে অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দেখভাল করার কেউ না থাকায় চলতি বছরের প্রথম দিকে মা বাধ্য হয়ে অসহায় এতিম শিশু দুটিকে এই মাদ্রাসার আবাসিক শাখায় ভর্তি করান। কিন্তু সেখানে শিক্ষার নামে চলত চরম নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন।
ভুক্তভোগী ১১ বছর বয়সী শিশুরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, মাঝে মাঝে বিকেলে নীচতলায় ‘হুজুর’ আব্দুর রহমান তাদের দুই বোনকে আলাদা আলাদা সময়ে তার রুমে ডেকে নিত। গা, হাত-পা টিপে দেওয়ার অজুহাতে সে শিশুদের জামা ও পায়জামার ভেতর হাত দিয়ে যৌন নিপীড়ন চালাত। এসব ঘটনা কাউকে বললে তাদের হত্যা করে হাউজের মধ্যে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিত ওই শিক্ষক। এমনকি শিশুদের ভয় দেখিয়ে বলত, তোর মা-বাবা খুঁজতে আসলে বলবো তোরা চলে গিয়েছিস।
ভুক্তভোগী শিশুদের মা তীব্র ক্ষোভ ও কান্নাভেজে গলায় জানান, বাচ্চাদের বাবা মারা যাওয়ায় তাদের দেখার কেউ ছিল না। তাই এতিম হিসেবে মেয়ে দুটিকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে আসলে মেয়েরা আর ফিরতে চাইত না। এবার তারা আসল সত্য প্রকাশ করেছে। হুজুর তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিত। একবার এক মেয়েকে জোর করে জাপটে ধরে শুইয়ে দিয়েছিল; মেয়েটি কোনোমতে জোর খাটিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসে।
তিনি আরও জানান, এর আগে কোচিং না করার অজুহাতে শিশু দুটিকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছিল। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ, ঘরে এনে খাওয়াব কী এই চিন্তায় তখন কিছু বলিনি। কিন্তু এখন যে জঘন্য ঘটনা ঘটেছে, আমি এর কঠিন ও সুষ্ঠু বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক মাওলানা আব্দুর রহমান সমস্ত ঘটনা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মাদ্রাসার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এসব রটাচ্ছে। তিনি উল্টো দাবি করেন, গত ২১ অক্টোবর তিনি ওই শিক্ষার্থীদের পালক পিতার বিরুদ্ধে ঝিকরগাছা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে ঝিকরগাছা এলাকায় বইছে তীব্র ক্ষোভের উত্তাপ। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি পবিত্র জায়গায় এতিম ও অসহায় শিশুদের ওপর এমন ন্যাক্কারজনক ও জঘন্য নিপীড়নের ঘটনায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
ধর্মীয় লেবাস ও শিক্ষকের পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পরিচালক আব্দুর রহমানকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
