৭১-এর চেতনায় আবারও ৭৫-এর কালো ছায়া
নিজস্ব প্রতিবেদক
পিরোজপুরে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দেলোয়ার হুসাইন সাঈদীর মামলার মূল বাদী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষবিদায় কেবল একটি দাফনের ঘটনা হয়ে থাকেনি; তা দাঁড়িয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের মানবিকতার চরম বিপর্যয় ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের এক করুণ দলিল হয়ে। জামায়াত ও শিবিরের বাধার মুখে দিনের আলোয় স্বসম্মানে দাফন তো দূরের কথা, রাতের অন্ধকারে ঘুটঘুটে আঁধারে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নিহতের স্ত্রী ও মেয়েরাই নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে শেষ ঠিকানায় শায়িত করেছেন এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
দেশবাসীকে এই অমানবিক দৃশ্য আশঙ্কাজনকভাবে মনে করিয়ে দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই কালো রাতের কথা—যখন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দাফনের সময়ও ঠিক একইভাবে রাতের আঁধারে সমস্ত নিয়ম ভেঙে তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল।
২৪ অক্টোবর সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে মারা যান ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। মৃত্যুর পর পিরোজপুরে নিয়ে এলে জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের নেতাকর্মীসহ একটি পক্ষ মরদেহ উপজেলা চত্বরে আনতেই বাঁধা সৃষ্টি করে। শুধু তা-ই নয়, নিহতের গ্রামের বাড়ি চিতলিয়ায় পরিবারের লোকজন যে কবরটি খুঁড়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ ক্যাডাররা গিয়ে সেই খোঁড়া কবরও ভরাট করে দেয়।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফন দূরে থাক, প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধরে সাধারণ একটি অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই পড়ে থাকে মানিক পশারীর মৃতদেহ। প্রশাসন বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার অজুহাতে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের চার দেয়ালের ভেতরে ‘গোপনে’ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গার্ড অব অনার শেষ করে দায় সারে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে মধ্যরাতে। পুলিশ পাহারায় মরদেহ নিজ গ্রামে নেওয়া হলেও কোনো পুরুষ বা প্রতিবেশী ভয়ে এগিয়ে আসার সাহস পাননি। অবশেষে রাত ২টার দিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কেবল মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটের আলো জ্বেলে চোখের জলে ভেসে ভেসে মানিক পশারীর স্ত্রী, সন্তান ও মেয়েরাই বাড়ির উঠানে বালি-মাটি খুঁড়ে কবর প্রস্তুত করেন এবং কোনোমতে মাটিচাপা দিয়ে লাশ দাফন করেন। স্বাধীন দেশের মাটিতে একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষযাত্রায় এমন নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সচেতন নাগরিকরা।
এই ধরনের মধ্যযুগীয় অমানবিকতার ঘটনায় ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের নীরব ও নির্লিপ্ত ভূমিকা। নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করলেও পিরোজপুরের মাটিতে এই পুরো ঘটনায় স্থানীয় কিংবা কেন্দ্রীয় বিএনপির কোনো নেতাকে প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিএনপি নেতাকর্মীরা কোনো কার্যকর ভূমিকা না রেখে কিংবা অন্যায়কে প্রতিহত না করে নীরবে এই অবমাননার দৃশ্য উপভোগ করেছেন, যা প্রকারান্তরে একটি অশুভ রাজনীতিকেই আশ্রয় দিচ্ছে।
জামায়াত ও মাসুদ সাঈদী নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে দাবি করেছেন মানিক পশারী নাকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে তারা ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশে সরকারি গেজেটভুক্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহের প্রতি এমন হিংস্র আচরণ ও কবর ভরাট করে দেওয়ার ঘটনাকে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবেই দেখছেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া দেশে আলো নিভিয়ে, রাত দুপুরে নারীদের হাত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দাফনের এই দৃশ্য সভ্য সমাজের বুকে এক গভীর ক্ষত ও লজ্জার দাগ কেটে দিয়ে গেল।
গত ২৪ অক্টোবর সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে আনা হয়। কিন্তু পিরোজপুরে পৌঁছানোর পরই স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডার বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণকৃত দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাসুদ সাঈদীর অনুসারী সন্ত্রাসীরা এলাকায় মব সৃষ্টি করে চরম তাণ্ডব চালাচ্ছে। মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে—”মানিক পশারীর লাশ পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না।” এমনকি জানাজায় ও দাফনে অংশ নিতে আসা সাধারণ মানুষকেও পিটিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষমতার দাপটে একটি মরদেহের ওপর এমন পাশবিক আচরণ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই মর্মান্তিক রূপ নেয় যে, রাতের দ্বিতীয় ভিডিওটিতে এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় দেখা যায়। রাতের আঁধারে যখন কোনো পুরুষ বা প্রতিবেশী ভয়ে এগিয়ে আসার সাহস পাননি। তখন নিহতের স্ত্রী ও মেয়েরাই চরম কান্নায় ভেঙে পড়ে শেষ রক্ষা করার চেষ্টা চালান।
লাশ সম্পূর্ণ পচে যাওয়ার উপক্রম হওয়ার আশঙ্কায় তিন জন নারী প্রাণপণে বাড়ির উঠানে বালি-মাটি খুঁড়তে শুরু করেন। কোদাল-শাবল না পেয়ে প্লেটে বা থালায় করে মাটি তুলে কবর প্রস্তুত করেন তাঁরা। স্বাধীন দেশের মাটিতে একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা এবং নিজ পরিবারের নারীদের এমন অসহায়ত্ব দেখে জাতি নিশ্চয় হতভাগ।
পরিবারের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন পুরো ঘটনায় কেবল দায়সারা কাজ করেছে। পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের ভেতরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে গার্ড অব অনার দিয়েই প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করে। দাফনের মূল নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এলাকার বর্তমান সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাসুদ সাঈদীর মদদে জামায়াত-শিবিরের লোকজন আগে থেকেই পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এছাড়া, নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দাবি করা বর্তমান বিএনপি সরকারের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এই অমানবিক ঘটনায় কোনো প্রতিবাদ না করে রহস্যজনক নীরবতা পালন করেছেন। যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
