নিজস্ব প্রতিবেদক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কেবল একটি মন্তব্য করার অপরাধে ২২ বছরের তরুণ মো. আবু বকর সিদ্দিককে সাত দিনের পুলিশি রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এমন চরম কঠোর পদক্ষেপে সাধারণ নাগরিক ও অধিকারকর্মীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই একে ‘তুচ্ছ বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত’ এবং ‘সরকারের দমনপীড়নের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২১ অক্টোবর। ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী একটি বাস নিয়ে পোস্ট করা হলে, আবু বকর সিদ্দিক নামক ওই তরুণ মন্তব্য করেন, ইস একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কোনো সাধারণ ধারায় নয়, বরং তার বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় সরাসরি ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’ মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় নিজের কোনো আইনজীবী না থাকায় তরুণ নিজেই বিচারককে বলেন, কমেন্টটি মজা করে করছি, কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু আদালত তার এই আত্মপক্ষ সমর্থন বা বয়স বিবেচনা না করেই ডিবি পুলিশের চাওয়া পুরো সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
একটি ফেসবুক কমেন্টের ওপর ভিত্তি করে পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ রিমান্ড আবেদনে যেসব যুক্তি দেখিয়েছে, তা শুনে আইনজীবী ও সুশীল সমাজের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনে দাবি করেন, এই তরুণের পেছনে কোনো ‘সুসংগঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’, ‘স্নাইপার বা অস্ত্র সরবরাহকারী চক্র’, কিংবা ‘মাস্টারমাইন্ড’ জড়িত আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন!
বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের খেয়ালি বা রসাত্মক মন্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধী চরমপন্থা বা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হিসেবে দাঁড় করানোর এই চেষ্টা সরকারের চরম ভীতি ও অতি-নিয়ন্ত্রণকামী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ফালতু বা কৌতুকপূর্ণ কমেন্টকে কেন্দ্র করে সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন’ করার ট্যাগ লাগিয়ে ২২ বছরের এক যুবককে যেভাবে দীর্ঘ রিমান্ডে নেওয়া হলো, তাতে ক্ষুব্ধ নেটিজেন ও মানবাধিকার কর্মীরা।
তাদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে কমেন্ট বা ট্রোলের জবাব আইনি ও গঠনমূলক হওয়া উচিত। কিন্তু সামান্য মন্তব্যে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা স্পষ্টতই বিরোধী মতামত ও জনকণ্ঠ স্তব্ধ করার রাজনৈতিক পাঁচতারা। মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ যুবকদের ট্র্যাকিং করে আটক করা এবং তাদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো যেমনটি এই তরুণের বাবাকে শুরুতে আটক করা হয়েছিল।এটা আইনের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।
একটি কমেন্টের কারণে একজন যুবকের জীবনে সন্ত্রাসবাদের তকমা লাগিয়ে তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠানো সরকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতার দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।
