ফোরটিন ডেস্ক : কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্প নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও দুই বছরের বেশি সময় নিয়মিতভাবে চালু করা যায়নি। অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এরই মধ্যে ৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধের কথা রয়েছে।
তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালকে নিয়োগের প্রস্তাব ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করেছে। পাঁচ বছরের জন্য এ চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
মহেশখালীর এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল বড় আকারের জাহাজ থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করে সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে সংরক্ষণাগারে পৌঁছে দেওয়া। এর ফলে সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের ধীর ও ব্যয়বহুল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমার কথা ছিল।
২০১৮ সালের আগস্টে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু করে বিপিসি। প্রকল্পের আওতায় সমুদ্র ও স্থলভাগ মিলিয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। একটি পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যটিতে ডিজেল পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত ছয়টি ট্যাংকের সঙ্গে পাইপলাইনগুলো যুক্ত করা হয়েছে। তিনটি ট্যাংক অপরিশোধিত তেল এবং তিনটি ডিজেল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহারের কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি নির্মাণ করেছে চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)। নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের মার্চে। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে গভীর সমুদ্রের জাহাজ থেকে তেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে তা তীরে পাঠানো হয়।
প্রকল্পটি চালু হলে বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস ও পরিবহনের সময় বর্তমান প্রায় ১১ দিন থেকে কমিয়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় আনার লক্ষ্য ছিল। বিপিসির প্রাথমিক হিসাবে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা ছিল। বর্তমানে আমদানি ও ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনায় সংস্থাটি বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করছে।
কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পটি নিয়মিতভাবে পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ করা যায়নি। শুরুতে সিপিপিইসিকে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর অপারেটর নিয়োগে আন্তর্জাতিক দরপত্রের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথমবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। একজন দরদাতা কারিগরিভাবে যোগ্য হলেও তার প্রস্তাব বিপিসির প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় দরপত্রটি বাতিল করা হয়। এরপর সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি পদ্ধতিতে অপারেটর নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় আসে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র জমার শেষ সময় ছিল ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কাগজ কিনলেও শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এগুলো হলো ইন্দোনেশিয়ার পিটি পারতামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল, চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং হংকংভিত্তিক হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং।
বিপিসির নথি অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য পিটি পারতামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালের মূল দর ছিল ১২৮ মিলিয়ন ডলার। আয়কর ও ভ্যাটসহ চুক্তির মোট মূল্য দাঁড়ায় ১৫৯ দশমিক ১৩৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে প্রকল্পের গ্যারান্টির মেয়াদে। সিপিপিইসির দেওয়া ১৮ মাসের ত্রুটি-দায়বদ্ধতার মেয়াদ ২০২৬ সালের আগস্টে শেষ হয়ে গেছে। অথচ তখনও এসপিএম নিয়মিত কার্যক্রমে যায়নি। ফলে এখন কোনো কারিগরি ত্রুটি বা যন্ত্রপাতিতে সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট মেরামতের ব্যয় বিপিসিকে বহন করতে হতে পারে।
এসপিএম চালু না হওয়ায় এতদিন বিপিসিকে পুরোনো পদ্ধতিতেই বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করতে হয়েছে। এর ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরও প্রত্যাশিত সাশ্রয় পাওয়া যায়নি। বিপিসির হিসাবে দুই বছরের বিলম্বে সম্ভাব্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সাশ্রয় হয়নি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, এত বড় সরকারি বিনিয়োগের পরও এসপিএম চালু হতে দেরি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, বিলম্বের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে দায়ীদের চিহ্নিত করা দরকার।
অবশেষে ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিটি পারতামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। চুক্তির আওতায় সমুদ্র ও স্থলভাগের এসপিএম স্থাপনা, মেরিন সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ থাকবে।
ফলে প্রায় দুই বছর ধরে পড়ে থাকা ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এই অবকাঠামো এখন নিয়মিত কার্যক্রমে যাওয়ার পথে। তবে প্রকল্পের দীর্ঘ বিলম্ব, গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং এই সময়ে সম্ভাব্য সাশ্রয় না পাওয়ার আর্থিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
