নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফকে ঘিরে আবারও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবার আজিমপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শেলটেক-রাফিদ জেভি।
এ ঘটনায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন ও কার্যাদেশের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) বাতিলের দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত ১৮ অক্টোবর প্রধান প্রকৌশলী বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, দরপত্র মূল্যায়নের সময় সরকারি ক্রয়বিধি ও দরপত্রের নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিশেষ করে দরপত্রের স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্টের (STD) ই-পিডব্লিউ৩ (e-PW3) ফরম্যাট অনুযায়ী পাস্ট পারফরম্যান্স ম্যাট্রিক্সের নম্বর সঠিকভাবে হিসাব করা হয়নি। এতে যোগ্যতা ও মূল্যায়নের দিক থেকে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, আজিমপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের ১০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি স্যানিটারি, পানি সরবরাহ, বৈদ্যুতিক কাজ এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটির প্যাকেজ নম্বর DM/DEV/GSS/NEW/WD-124 এবং দরপত্র আইডি 1143162।
শেলটেক-রাফিদ জেভির দাবি, দরপত্রে তাদের প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। মূল্যায়নে তাদের সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী পাস্ট পারফরম্যান্স ম্যাট্রিক্সের নম্বর যথাযথভাবে হিসাব না করেই অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। ৩ কোটি টাকার উপর এক্ষেত্রে লেনদেন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অতীত কাজের অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নে তাদের প্রতিষ্ঠান অন্যদের তুলনায় এগিয়ে ছিল। কিন্তু মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সেই বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ অবস্থায় জারি করা NOA বাতিল করে সব প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ও পাস্ট পারফরম্যান্স ম্যাট্রিক্স পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে তারা। অন্যথায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে আনিক ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন, যোগ্যতা এবং দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় তাদের স্কোর কত ছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আগেও বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়েছিলেন শরীফ
মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের অতিরিক্ত ও অগ্রিম বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় আইডিয়াল কলেজের আটতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণে শফিক এন্টারপ্রাইজকে ৯৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগ ছিল। একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবন নির্মাণে দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ ছাড়া মিরপুরের সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের খেলার মাঠ ও রাস্তা নির্মাণে অনিতা এন্টারপ্রাইজকে ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগ ছিল।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তদন্ত, ব্যক্তিগত শুনানি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পর ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতির প্রায় দুই বছর পর ২০২৬ সালের ২১ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে চাঁদপুর থেকে তাঁকে আবারও ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর পরপরই পুরোনো কর্মস্থলে তাঁর পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়।
নতুন অভিযোগে আবারও প্রশ্ন
পুরোনো অভিযোগের পর বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও এবার নতুন করে সরকারি উন্নয়নকাজের দরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত একটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফকে একাধিকবার কল দিলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও তিনি দেননি।
