ফোরটিন ডেস্ক : ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবই মুদ্রণকে ঘিরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মানসম্মত কাগজ ফিরিয়ে দিয়ে সিন্ডিকেটের কাছ থেকে টনপ্রতি ২২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে নিম্নমানের কাগজ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে ছাপাখানাগুলোকে। এভাবে প্রায় ২৫ হাজার টন কাগজে কারসাজি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ বইয়ের খাত থেকে সিন্ডিকেটটি হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত ৫৫ কোটি টাকা। এমনকি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে বা অন্যায্য ছাড়পত্র দিতে না চাইলে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের বাসা পর্যন্ত গিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার মতো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন এনসিটিবির নির্ধারিত মান বজায় রেখেই বিএইচএল পেপার মিলস লিমিটেড থেকে কাগজ কিনে তাঁর প্রেসে এনেছিলেন। কিন্তু খবর পেয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে এনসিটিবির একটি পরিদর্শক দল সেখানে গিয়ে কোনো ধরনের ল্যাব পরীক্ষা ছাড়াই কাগজগুলোকে ‘অনুপযোগী’ ঘোষণা করে। পরে বাধ্য হয়ে সেই কাগজ ফেরত দিয়ে সিন্ডিকেট চক্রের নির্ধারিত এজেন্ট থেকে টনপ্রতি অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে আগের চেয়েও নিম্নমানের কাগজ কেনেন তিনি; যার পরপরই দ্রুত অনুমোদন মিলে যায়।
জানা গেছে, বাজারে যে কাগজের দর টনপ্রতি ১ লাখ ৩ হাজার টাকা, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা ছাপাখানাগুলোকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। এনসিটিবির পরিদর্শনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন যে, প্রথমে আনা কাগজটির মান শতভাগ সঠিক ছিল, কেবল সিন্ডিকেটকে অনৈতিক মুনাফা পাইয়ে দিতেই অনুমোদন আটকে দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছু ছাপাখানার মালিক ওপর মহলে যোগাযোগ করে এই জিম্মিদশা এড়াতে পেরেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ পেপারের মান ভালো হওয়া সত্ত্বেও অনুমোদন না দেওয়ায় এক মালিক শিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে সেই ৯০০ টন কাগজের অনুমোদন দিতে বাধ্য হয় এনসিটিবি।
সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এখানেই থামেনি; দুই লাখ বই ছাপিয়ে কাগজে-কলমে আড়াই লাখ দেখিয়ে ভুয়া ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এনসিটিবির এক পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাসায় গিয়ে ‘চোখ উপড়ে ফেলার’ হুমকি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রেসের দুর্বৃত্তরা। পুরো ঘটনা এনসিটিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। এমনকি এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের আর্থিক লুটপাটের মাঝেই বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন অর্থাৎ আগামী ২৪শে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক এবং ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে মাধ্যমিকের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাতুয়াইলসহ বিভিন্ন এলাকার প্রেসে একটানা কাজ চলছে। এনসিটিবির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিক স্তরের ৭২ দশমিক ১৩ শতাংশ বই ছাপা সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কোটি কোটি টাকার এই সিন্ডিকেট বাণিজ্য আর নিম্নমানের কাগজের বলি হয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে কেমন বই পৌঁছাবে, তা নিয়ে।
