ফোরটিন ডেস্ক : মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগান ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ এবং দেয়ালে লেখার অপরাধে দেশের দুই জেলায় স্কুলশিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দমনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চুয়াডাঙ্গায় বসতবাড়ির দেয়ালে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হাসিনা’ ও ‘ফিরছি আবার ডিসেম্বরে’ স্লোগান লেখার ঘটনায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের চিহ্নিত করতে পুলিশি তৎপরতা শুরু হওয়ায় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে গোপালগঞ্জে শ্রেণিকক্ষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় সরকারি জেলা স্কুলের ৯ জন শিক্ষার্থীকে একযোগে ছাড়পত্র (টিসি) দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের শেখপাড়ার একটি গলিতে গত ৪ঠা নভেম্বর জন্মদিনের আনন্দ উদযাপনের সময় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী একটি প্রাচীরে স্প্রে দিয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হাসিনা’, ‘মুজিব সেনা’ ও ‘ফিরছি আবার ডিসেম্বরে’ স্লোগান লেখে। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা কোমলমতি এই ছাত্রীদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রকাশ্যে তাদের ‘দমন করার’ দাবি জানায়। অন্যদিকে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় থানা-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত তৎপরতা শুরু হলে স্থানীয় সচেতন মহল ও সংস্কৃতিকর্মীরা তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন। সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ফেলে রেখে মাত্র কয়েকটি দেয়াললিখনের পেছনে পুলিশ এমনভাবে লেগেছে, যেন কোনো বড় অপরাধী চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে; যার ফলে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ছাত্রীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কারও প্ররোচনা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে গোপালগঞ্জ সরকারি জেলা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে গত ৬ই অক্টোবর টিফিনের পর ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির নয়জন শিক্ষার্থীকে বৃহস্পতিবার একসঙ্গে টিসি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে স্লোগান দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা। নামাজের পর প্রধান শিক্ষক মো. জিয়াউল হককে ফোন করে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই নয়জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সচেতন মহলের মতে, কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দেওয়া এবং স্কুলছাত্রীদের পেছনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ও পুলিশি যন্ত্র লেলিয়ে দেওয়ার এই ঘটনাগুলো দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সহনশীলতার চরম অবনতিকেই নির্দেশ করে।
