ফোরটিন ডেস্ক : অধিকার আদায়ে রাজপথে নামলেই নির্বিচার গুলিবর্ষণ, দমন-পীড়ন, খুন আর গায়েবি মামলায় নিরীহ মানুষকে কারারুদ্ধ করার এক দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র শাসন আমলগুলোর সঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত লাখো শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার দমনের ঘটনা সেই পুরোনো ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনের সময় সহিংসতার দৃশ্য ধারণ করায় গাইবান্ধা থেকে পরিবারের হাল ধরতে আসা তরুণ পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
তবে মেহনতি মানুষের রক্ত ঝরানোর এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দলটির রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার অতীত রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শ্রমিক-কৃষকদের দাবি রুখতে বারবার বুলেটের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালের ২৪ মে দৈনিক নিউ এজ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে মজুরির দাবিতে আন্দোলন দমনে সাভারের আশুলিয়ায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তিন পোশাকশ্রমিককে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের হামলায় আহত হয়েছিলেন অন্তত তিন হাজার শ্রমিক।
একই বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে রাস্তায় নামা সাধারণ পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর পুলিশ প্রথম গুলিবর্ষণ করে দুইজনকে হত্যা করে। পরবর্তীতে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা সেই নাগরিক আন্দোলনে কৃষক, দিনমজুর ও সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশ ও বিডিআরের যৌথ অভিযানে মোট ১৭ জন প্রাণ হারান।
কৃষকের পেটে ভাতের জোগানের সার চাওয়ার অপরাধেও গুলির মুখে পড়তে হয়েছিল এ দেশের মানুষকে। ১৯৯৫ সালের মার্চে বিএনপি সরকারের আমলে তীব্র সার ও জ্বালানি সংকটের প্রতিবাদে দেশজুড়ে কৃষক বিক্ষোভ শুরু হলে পুলিশের গুলিতে অন্তত ১২ জন নিরীহ কৃষক প্রাণ হারান। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (ইউপিআই)-এর ১৯৯৫ সালের ৪ এপ্রিলের আর্কাইভে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য নথিবদ্ধ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পিতা থেকে শুরু করে তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক ধারাতেই এই রক্তপাত অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের ঘটনার পর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, কে এন হুদা (বীর উত্তম) এবং এ টি এম হায়দার (বীর বিক্রম)-এর মতো বীর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান দমনের নামে জিয়াউর রহমানের গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ১৪৩ জন সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যকে গণফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৮ সালের মার্চের মধ্যেই প্রায় ৬০০ সামরিক সদস্যের ফাঁসি কার্যকর হয়। এছাড়া ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বিমানবাহিনীর দাপ্তরিক পুস্তিকার বরাতে ইউপিআই জানায়, কেবল ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ঘটনার জেরেই ৫৬১ জন বিমানসেনাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের রাজপথ—সামরিক সদস্য থেকে শুরু করে কৃষক ও সাধারণ শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, গণতন্ত্র ও ন্যায্য অধিকারের বিপরীতে বারবার পেশিশক্তি ও বলপ্রয়োগের রাজনীতিতেই ভর করেছে দলটি।
