নিজস্ব প্রতিনিধি : পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের হাড়িয়াকাহন গ্রামে এক বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টার গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মাত্র ২০টি ‘জুতার বাড়ি’ দিয়ে রফা করার অভিযোগ উঠেছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে সালিশের লঘু রায় প্রত্যাখ্যান করে ভুক্তভোগী নারীর বড় ভাই বাদী হয়ে আজ সোমবার সাঁথিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৬ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে ভুক্তভোগী ওই বাকপ্রতিবন্ধী নারী বাড়িতে একা ছিলেন। সেই সুযোগে প্রতিবেশী মৃত তায়জাল খাঁ-এর তৃতীয় পুত্র মহব্বত আলী খাঁ ওই নারীর বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালান। এ সময় ওই নারীর আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে লম্পট মহব্বত আলীকে হাতেনাতে আটক করেন। তবে এই গুরুতর অপরাধের ব্যাপারে থানায় কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতার উপস্থিতিতে একটি গ্রাম্য সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে মহব্বত আলীকে শারীরিক শাস্তি হিসেবে কেবল ‘২০টি জুতার বাড়ি’ দেওয়ার রায় ঘোষণা ও তা তাৎক্ষণিক কার্যকর করা হয়।
ভুক্তভোগী নারীর ভাই এরশাদ ও ভাবি মরিয়ম খাতুন জানান, নাসির খানের আহ্বানে গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাবের সভাপতিত্বে এই বিতর্কিত সালিশি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ১নং ওয়ার্ডের জামায়াতের আমির বাবু মোল্লা, ১নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আ. মালেক, ২নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আরশেদ আলম ও খোরশেদ আলমসহ স্থানীয় মাতব্বরেরা উপস্থিত ছিলেন। ভুক্তভোগীর ভাবি মরিয়ম খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সালিশের প্রধানরা ২০টি জুতার বাড়ির রায় ঘোষণা করে তা কার্যকর করেন। আমাদের লোকজনকে সেখানে কোনো কথাই বলতে দেওয়া হয়নি। আমরা এই অন্যায্য সালিশের রায় মানি না।”
ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশে করার সুযোগ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে অপরাধীকে দ্রুত পুলিশের কাছে সোপর্দ করা উচিত ছিল বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী। এ বিষয়ে গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের জামায়াতের আমির বাবু মোল্লা বলেন, “বিচার করেছেন মেম্বার-চেয়ারম্যান, আমি শুধু বিচারে গিয়েছিলাম। প্রথমে তাকে ৭টা জুতার বাড়ি দিয়ে গলায় কাদা মেখে সারা এলাকা ঘোরানোর কথা ছিল। কিন্তু আমি বলেছি, এটা না করে ২০টা জুতার বাড়ি দেন। জুতার বাড়ি দিয়ে দুই পক্ষের স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছে।”
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব প্রামাণিক সালিশের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, “সালিশে আমাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল, ওরাই মূলত বিচার করেছে। আমার পরিষদের গ্রাম পুলিশ দিয়েই জুতার বাড়িগুলো দেওয়ানো হয়। এই বিচারের ঘটনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে আমি বাদীপক্ষকে আইনের আশ্রয় নিতে বলেছি।” এদিকে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে তাঁরা সালিশি বৈঠকের বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ইতিমধ্যে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং আজকেই নিয়মিত মামলা রুজু করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
