২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর মতিঝিলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ভবনের সামনে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার ওপর নকল ব্যান্ডেজ পরে হামলা চালিয়ে তুমুল সমালোচিত হওয়া সেই ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র নেতা আরিফ আল খবির এবার দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী তথা হিন্দুদের দেশছাড়া করার প্রকাশ্য ও চরম উস্কানি দিয়ে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। বর্তমানে ভোল বদলে ‘ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা’ নামক একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়কের দায়িত্ব নেওয়া এই ব্যক্তির এমন উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের একটি সাম্প্রতিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
জানা গেছে, গতকাল ১১ জুলাই শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক উগ্র সমাবেশে ইনসাফ নেতা আরিফ আল খবির অত্যন্ত আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিভাগ থেকে হিন্দুদের চাকরিচ্যুতির দাবি তুলে তিনি বলেন, “আমাদের সচিবালয়ে একটা বড় প্রশাসনিক পদে থেকে মনোরঞ্জন মধু প্রতিদিন ফেসবুকে কুরুক্ষেত্রের কথা ঘোষণা করে। তিনি বাংলাদেশে থেকে এত কথা বলার সাহস পায় কেমনে? সরকারের সচিবালয়, পুলিশ, আইন, প্রশাসন, বিজিবি সমস্ত কিছু থেকে এবং সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী সবকিছু থেকে হিন্দুদেরকে বহিষ্কার করতে হবে।” একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অজুহাত তুলে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) ছাড়াও এ দেশীয় ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন ইসকন, হিন্দু মহাজোট এবং সনাতন বিদ্যার্থী সংসদকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ঢালাওভাবে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে চরম আপত্তিকর কুযুক্তি উপস্থাপন করেন আরিফ। মিরপুরের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “একটা হিন্দুর পেটে গুঁতা মারবেন, তারা দৌড় দেবে ভারতে। প্রমাণ কি জানেন? এই যে কয়দিন আগে আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই মিরপুরে একটা মন্দিরের পাশে কলাগাছ কাটা হয়েছিল। এই কলাগাছটা কেন কেটেছে? এজন্য মন্দির কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকার, পুলিশ কারও কাছে বিচার দেয় নাই। সরাসরি বিচার দিয়েছে ভারতের কাছে। পরে ভারত থেকে আমাদের সরকারকে চাপ দেওয়া হয়েছে। সরকার দৌড়ে গিয়ে কলাগাছ যারা কেটেছে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। পারলে হিন্দুদের মাথায় তুলে নাচা শুরু করে দিয়েছে সরকার।” উগ্রতার চরম সীমায় গিয়ে তিনি আরও বলেন, “হিন্দু কিছু হলেই, গুঁতা মারলেই ভারতকে বলে। তাহলে হিন্দুরা কার দালাল? ভারতের দালাল। বাংলাদেশটা পয়মাল করে দিয়েছে। এই হিন্দুদেরকে উৎখাত করা উচিত।”
সমালোচকদের মতে, এই উগ্রবাদী ব্যক্তি সমাজে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে প্রতিনিয়ত ভোল পাল্টান এবং নতুন নতুন উগ্র জাতীয়তাবাদী দাবি সামনে নিয়ে আসেন। গতকালের ওই একই সমাবেশ থেকে তিনি আমেরিকার কাছে বাণিজ্য চুক্তির নামে দেশ বিক্রি এবং দেশের খনি ও সেন্টমার্টিন (নারিকেল) দ্বীপ হস্তান্তরের কাল্পনিক চক্রান্তের অভিযোগ তোলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে। একই সাথে ড. ইউনূস ও তাঁর সহযোগীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি নিশ্চিত করারও ধৃষ্টতাপূর্ণ দাবি জানান এই ইনসাফ নেতা।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের শুরুতে পাঠ্যবইয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দসংবলিত গ্রাফিতি জোরপূর্বক মুছে দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনরত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল এই আরিফের নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’। সে সময় পুলিশ আরিফ আল খবির ও মো. আব্বাস নামের দুজনকে আটক করার পর দেখা যায়, তারা মাথায় নকল ব্যান্ডেজ বেঁধে আদিবাসীদের ওপর দোষ চাপাতে ফেসবুকে লাইভ করে জনসহানুভূতি পাওয়ার অপচেষ্টা করছিল। গণমাধ্যমে তাদের সেই জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর তারা চরম নিন্দার মুখে পড়ে। এবার নতুন মোড়কে ‘ইনসাফ’ প্ল্যাটফর্মের আড়ালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎখাত ও সরকারপ্রধানের ফাঁসি দাবির উস্কানিমূলক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর, দেশের অসাম্প্রদায়িক সামাজিক পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই উগ্রবাদীর বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন দেশের সাধারণ নাগরিক ও নেটিজেনরা।
