নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর ও নৃশংসতম চরমপন্থী হামলা—গুলশানের হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১লা জুলাই কূটনৈতিক পাড়ার এক রেস্তোরাঁয় ৫ জঙ্গির আত্মঘাতী হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ অভিযানের এক দশক পেরিয়ে গেলেও, দেশজুড়ে নতুন করে উগ্রবাদের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে দেশের একাধিক হাই-সিকিউরিটি কারাগার থেকে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের পলায়নের পর থেকে ৩১১ জন দাগি ও দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি এখনও অধরা থাকায় দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে সাড় ৫ বছর আগে বিচারিক আদালত ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট সেই সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ হিসেবে ঝুলে রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, বিচারক-স্বল্পতাসহ নানা বাস্তবতার কারণে দ্রুত শুনানি সম্ভব না হলেও রাষ্ট্রপক্ষ এটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে। এর মাঝেই চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই মামলার অন্যতম দণ্ডিত আসামি আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে বন্দি পলায়নের হট্টগোলের সময় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। সেদিন কারাগার ভেঙে ২০২ জন বন্দি পালিয়ে যায়।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বাইরে ও ভেতরে আত্মগোপনে থাকা পলাতক ৩১১ জঙ্গির মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জেএমবি’র ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হুজি-বি’র ১৬ জন, নব্য জেএমবি’র ১৬ জন এবং হিযবুত তাহরীর ও আল্লাহর দলের বেশ কয়েকজন সদস্য রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের ৫০০টি থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া হাজার হাজার অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার না হওয়ায়, এই পলাতক জঙ্গিরা ফের সংগঠিত হয়ে দেশের শান্তি বিঘ্নিত করার বড় হাতিয়ার পেয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জামিনে মুক্ত হওয়া ১ হাজার ৬১১ জন জঙ্গির মধ্যে অন্তত ৩৮০ জন জামিন পেয়েছেন ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরবর্তী সময়ে। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত ও ব্লগার হত্যাসহ একাধিক জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দিন রাহমানী (যিনি ২০২৪ সালের ২০শে অক্টোবর মুক্ত হন) এবং নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমানও রয়েছেন। কারামুক্তির পর রাহমানী আবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার করছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে, ২০০৫ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে একযোগে ৫০০ বোমা হামলার মতো ভয়াবহ অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে, জামিনপ্রাপ্ত ও পলাতক এই উগ্রপন্থীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছেন দেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
