নিজস্ব প্রতিনিধি : যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার দ্বন্দ্বকে আবারও প্রকাশ্যে এনেছে ম্যাসাচুসেটসের এক আবেগঘন বহিষ্কারের ঘটনা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে মার্কিন মুলুকে বৈধভাবে কর পরিশোধ করে বসবাস করার পরও, শেষ পর্যন্ত নিজ দেশ হন্ডুরাসে ফেরত পাঠাতে হয়েছে মার্গারিটা মেলগার নামের এক তিন সন্তানের মাকে। আদালতের চূড়ান্ত আদেশে তাঁর সঙ্গে যেতে হয়েছে তাঁরই ১০ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক কন্যাকে, যে এর আগে কখনো মায়ের পৈতৃক ভিটা চোখেও দেখেনি। এই ঘটনার পর বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, যা উত্তর আমেরিকার অভিবাসী সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইনি নথি ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে পারিবারিক সহিংসতা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার কবল থেকে বাঁচতে দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন মার্গারিটা। ম্যাসাচুসেটসে বসবাসকালীন তিনি নিয়মিত ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের (আইস) নির্দেশনা মেনে হাজিরা দিতেন এবং দুটি প্রতিষ্ঠানে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি নিয়মিত কর পরিশোধ করতেন। মেলগারের আইনজীবীর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাঁর এক প্রতিবন্ধী কন্যার দেখভালের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলাটি পুনরায় খোলার আবেদন অভিবাসন আপিল বোর্ডে বিচারাধীন ছিল। তবে আদালত বহিষ্কার কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদনটি নাকচ করে দেওয়ায় আইনিভাবে এই বহিষ্কারাদেশ কার্যকর হয়।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে মার্গারিটার সন্তানদের। বহিষ্কারের চূড়ান্ত মুহূর্তে মার্গারিটাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তিনি কি প্রতিবন্ধী ও নাবালিকা ছোট মেয়েকে একাকী আমেরিকায় ফেলে যাবেন, নাকি অচেনা এক দেশে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। শেষ পর্যন্ত ১০ বছরের কন্যাকে নিয়ে তিনি দেশ ছাড়লেও, তাঁর ২০ বছর বয়সী কলেজপড়ুয়া বড় মেয়ে এবং ১৭ বছর বয়সী মেঝ মেয়েটি যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যায়। ফলে একটি সাজানো পরিবার রাতারাতি দুই মহাদেশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বোস্টন বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তে প্রিয় খেলনা আর বিশ্বকাপের স্টিকার বই হাতে ছোট্ট মেয়েটির কান্না উপস্থিত সকল যাত্রীকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
যদিও মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস) বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা ‘পরিবার বিচ্ছিন্ন করার নীতি’ অনুসরণ করে না এবং মার্কিন নাগরিক শিশুদের রাখার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়; তবে অভিবাসন অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো এই যুক্তি মানতে নারাজ। বাস্তব ক্ষেত্রে এমন কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছেযেখানে একদিকে দেশের আইন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়া পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে মানবাধিকারের সর্বোচ্চ সুরক্ষার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
