২০২৫ সালের বর্ষায় ঢাকার বহু সড়ক আবারও পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোমরসমান পানি পেরিয়ে বাবা-মায়েরা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একই সময়ে পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া আজ এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা শুধু পরিবেশ নয়; অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—দক্ষিণ এশিয়া কি এই বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সত্যিই প্রস্তুত?
সংকটের গভীরতা: প্রকৃতি থেকে জীবিকার লড়াই
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবন বহু শতাব্দী ধরে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, নদী এবং হিমালয় থেকে উৎসারিত পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বিশ্বের গড়ের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে হিমবাহ দ্রুত গলছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসছে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত ক্রমেই অনিয়মিত ও তীব্র হয়ে উঠছে। কখনও দীর্ঘ খরা, কখনও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি—এই চরম আবহাওয়া কৃষি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকাকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় অতিরিক্ত ছয় কোটিরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। ফলে হাজার হাজার কৃষক জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। অন্যদিকে, তীব্র তাপপ্রবাহে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্রমজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় উৎপাদনশীলতা ও আয় হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাই কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও মর্যাদার সংকট।
কেন দক্ষিণ এশিয়া সবচেয়ে ঝুঁকিতে?
এই সংকট দক্ষিণ এশিয়ায় আরও গভীর হওয়ার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। বিপুল জনসংখ্যা, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, দারিদ্র্য, সীমিত অবকাঠামো এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এই অঞ্চলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, বিশ্বের মোট ঐতিহাসিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দক্ষিণ এশিয়ার অবদান তুলনামূলকভাবে খুবই কম, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর অভিঘাতগুলোর একটি এই অঞ্চলকেই বহন করতে হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সীমিত আঞ্চলিক সহযোগিতা। অথচ নদী, বায়ু, মৌসুমি বৃষ্টি কিংবা হিমবাহ কোনো রাষ্ট্রের সীমানা মানে না। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আন্তঃসীমান্ত সংকট মোকাবিলায় একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। যৌথ তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নদী অববাহিকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহযোগিতা ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রস্তুতির সময় এখনই: সহযোগিতা, সবুজ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক দায়িত্ব
দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখনও সম্ভাবনার দুয়ার খোলা রয়েছে। প্রথমত, আঞ্চলিক সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও ভূমিধসের আগাম সতর্কবার্তা বিনিময়, যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুবিষয়ক গবেষণায় সমন্বিত উদ্যোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় জলবায়ু অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, কার্যকর নগর পরিকল্পনা, জলাধার সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়; টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।
তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সবুজ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। সবুজ কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু সংকটকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব।
একই সঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলোরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; বৈশ্বিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
দক্ষিণ এশিয়ার সামনে আজ দুটি পথ খোলা—একটি নিষ্ক্রিয়তার, অন্যটি দূরদর্শী নেতৃত্বের। যদি আমরা আজই সাহসী নীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারি, তবে এই অঞ্চল কেবল জলবায়ু সংকটের ভুক্তভোগী হিসেবেই নয়, বরং বিশ্বকে পথ দেখানো একটি সফল অভিযোজনের মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
প্রশ্নটি তাই এখনও একই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের এই সময়ে দক্ষিণ এশিয়া কি প্রস্তুত? উত্তরটি নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্ত, নীতিনির্ধারণ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি আজকের বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময় এখনই।
লেখক: মোঃ সাদী মুস্তাকিম সরকার শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ
