নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল-কায়দার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা—আল-কায়দা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)—সন্ত্রাসী সেল ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী পর্যবেক্ষণ দল।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের Analytical Support and Sanctions Monitoring Team-এর ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়দা-সংক্রান্ত ৩৮তম প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ২৭৩৪ (২০২৪)-এর অধীনে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নথি হিসেবে প্রকাশিত হয়। (OpIndia)
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় হামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে AQIS-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দল বাংলাদেশকে ব্যবহার করে AQIS-এর সেল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। (The Business Standard)
বড় সংগঠনের বদলে ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেল
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, AQIS এখন আগের তুলনায় আরও বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। বড় ও কেন্দ্রীভূত ইউনিটের পরিবর্তে ছোট, বিচ্ছিন্ন ও বিকেন্দ্রীভূত সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনটি নিজস্ব লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। (The Business Standard)
এ ধরনের কাঠামো সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থাগুলোর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ ছোট ছোট সেলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সীমিত থাকলে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা খুব বেশি পরিবর্তিত না হলেও সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ায় হুমকি বেড়েছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘাত এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (TTP) ধারাবাহিক হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। (OpIndia)
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আফগানিস্তানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তালেবান কর্তৃপক্ষ ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (ISIL-K) ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলেও পুরো সন্ত্রাসী হুমকি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা সক্ষম হয়নি। (The Business Standard)
আল-কায়দার নেতৃত্ব দুর্বল, তবে ঝুঁকি শেষ হয়নি
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দল বলেছে, আল-কায়দার শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। সংগঠনটির বিদেশে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ও অভিপ্রায়ও এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আঞ্চলিক শাখাগুলো নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। (OpIndia)
প্রতিবেদনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আল-কায়দা ও ইসলামিক স্টেটের বিভিন্ন শাখা অর্থ সংগ্রহের জন্য অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়কেও গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। (OpIndia)
বাংলাদেশের জন্য নতুন সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে AQIS-এর সম্ভাব্য সেল গঠনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানকেন্দ্রিক বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্কের তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘ ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তবে প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আল-কায়দার পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা জাতিসংঘ দেয়নি। বরং বাংলাদেশকে ব্যবহার করে AQIS ভবিষ্যতে সেল বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে—এই সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। (OpIndia)
জাতিসংঘের এই নতুন মূল্যায়ন দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আঞ্চলিক গোয়েন্দা সহযোগিতা, সীমান্ত নজরদারি, সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধ এবং অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধ আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম Analytical Support and Sanctions Monitoring Team Report (S/2026/651); The Business Standard; The Financial Express। (OpIndia)
ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ
ঢাকাকে ঘিরে বাড়ছে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক তৎপরতা।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেন দিন দিনই বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান, ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে ঢাকা এখন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর বিশেষ নজরে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট তৎপরতা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে। ঢাকায় বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সফরকে অনেকেই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখছেন।
এরই মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—RAW-এর প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছেন—এমন খবর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর সফরের উদ্দেশ্য কী, কার সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে এবং আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও তুরস্কের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে। যদিও এসব সফরের সব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়, তবু ধারাবাহিক যোগাযোগের খবর বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই এর অন্যতম বড় কৌশলগত সম্পদ। বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, পাকিস্তান, তুরস্কসহ বিভিন্ন শক্তির নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে ঢাকাকে ঘিরে।
সামনে কী?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই বহুমুখী আন্তর্জাতিক আগ্রহকে কীভাবে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো যায়। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়; বরং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে ঢাকার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
কারণ ভূ-রাজনীতির এই দাবার খেলায় বাংলাদেশ আর নিছক দর্শক নয়। ঢাকা এখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘর, যাকে ঘিরে একাধিক শক্তি নিজেদের কৌশল সাজাচ্ছে।
আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশকে ঘিরে কি নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে?
