নিজস্ব প্রতিনিধি : সুশাসন ও সংস্কারের বড় বড় বুলির আড়ালে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে দেশের চরম ক্ষতিসাধন এবং নজিরবিহীন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের এক ভয়ঙ্কর মহোৎসবের অভিযোগ উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সর্বশেষ ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ’ দেশের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে।
সংস্থাটির বিস্ফোরক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান জমানার মাত্র ১ বছরে দেশের সাধারণ মানুষ যখন পদে পদে হয়রানির শিকার, তখন কেবল রাষ্ট্রীয় সেবা খাতেই রেকর্ড ১২,৬৩৩ কোটি টাকার মহাবিপুল ঘুষ ও দুর্নীতির লেনদেন হয়েছে। দেশের ৮১.৬ শতাংশ আমজনতা যখন এই তীব্র प्रशासनिक দুর্নীতির যাতাকলে পিষ্ট হয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন, ঠিক তখনই খোদ সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষিগত করে নিজের এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর আখের গোছানোর অকাট্য প্রমাণ সামনে এসেছে।
সরকারি গেজেট, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী ও আদালতের রায়ের নথি বিশ্লেষণ করে দেশের ক্ষতি করে ড. ইউনূসের নিজের পকেট ভারী করার ৯টি সুনির্দিষ্ট মেগা খতিয়ান বিস্তারিতভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রথম খতিয়ান অনুযায়ী, ‘অদৃশ্য হাতে’ নিজের সব মামলা উধাও করা হয়েছে। অর্থপাচার, জালিয়াতি ও শ্রম আইন লঙ্ঘনসহ একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলায় সরাসরি অভিযুক্ত ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যেখানে দেশের সাধারণ নাগরিকদের সামান্য একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় জুতো ক্ষয় করতে হয়, সেখানে ক্ষমতার শীর্ষ চেয়ারে বসামাত্রই এক ‘অদৃশ্য হাতের’ ইশারায় তাঁর ঘাড়ে থাকা সমস্ত মামলা মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ খারিজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
দ্বিতীয় খতিয়ানটি হলো রাষ্ট্রীয় কোষাগার ঠকিয়ে ৬৬৬ কোটির কর ফাঁকি দেওয়া। আইনি মারপ্যাঁচ ও ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার কর সম্পূর্ণ ‘মওকুফ’ করিয়ে নিয়েছেন তিনি। করের এই বিশাল টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল, যা দিয়ে দেশের রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা চুষে নিজের প্রতিষ্ঠানের এই মেগা কর মওকুফ সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত।
তৃতীয় খতিয়ান অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরের জন্য রাজস্ব আয় করমুক্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। লুটপাটের এখানেই শেষ নয়; রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তোয়াক্কা না করে আগামী ৫ বছরের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন সব কটি প্রতিষ্ঠানের কর মওকুফ নিশ্চিত করে নিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়ের এই বিশাল পথ বন্ধ করে দিয়ে নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যকে করমুক্ত রাখার এমন অনৈতিক সুবিধা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোনো সরকারের আমলে কোনো ব্যক্তি পাননি।
চতুর্থ খতিয়ানটি হলো গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি অংশীদারিত্ব ২৫% থেকে ১০%-এ খর্ব করা। গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়ার জন্য এক সুদূরপ্রসারী চাল চালেন ড. ইউনূস। ব্যাংকটিতে সরকারের দীর্ঘদিনের ২৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা মালিকানা এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ ব্যাংকের মূল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে এক অদৃশ্য ‘নামহীন’ প্রাইভেট ও কর্পোরেট শক্তির হাতে, যা সাধারণ আমানতকারীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
পঞ্চম খতিয়ান অনুযায়ী, ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রভাব ও ক্ষমতার চ্যানেল ব্যবহার করে একচেটিয়াভাবে তড়িঘড়ি অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন বা জাতির কল্যাণের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় টাকায় নিজের নাম ও ব্যক্তি-ব্র্যান্ডিংয়ের চূড়ান্ত প্রচার নিশ্চিত করাই এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল নেপথ্য উদ্দেশ্য বলে তথ্য মিলেছে।
ষষ্ঠ খতিয়ানটি হলো জনশক্তি রপ্তানির শ্রমবাজার একচেটিয়া দখল করা। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে ‘গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস’-এর মাধ্যমে বিদেশের বিশাল জনশক্তি রপ্তানির বাজার একচ্ছত্রভাবে দখলের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের রেমিট্যান্স খাতের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো শ্রমবাজারের মনোপলি চলে যাচ্ছে সরাসরি ড. ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে।
সপ্তম খতিয়ান অনুযায়ী, ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে একাধিপত্য কায়েম করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে কোণঠাসা করতে গ্রামীণ টেলিকমকে বিশেষ সুবিধায় ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের আর্থিক লেনদেনের ডাটা এবং বিশাল অঙ্কের ক্যাশ ফ্লোর ওপর ইউনূস-গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার আইনি লাইসেন্স তৈরি করা হলো।
অষ্টম খতিয়ানটি হলো টেন্ডার ছাড়াই ৭০০ কোটির সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গায়েব করা। সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে সমাজকল্যাণ मंत्रालयের ৭০০ কোটি টাকার সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল হস্তান্তরের মাধ্যমে। দেশের কোনো নিয়ম বা ওপেন টেন্ডারের তোয়াক্কা না করে, সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতাহীন বিশেষ SSS পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় এই বিশাল ফান্ড সরাসরি ট্রান্সফার করা হয়েছে ‘গ্রামীণ ট্রাস্টে’। অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত এই বিশাল অর্থ এভাবে একক ট্রাস্টে চলে যাওয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নবম খতিয়ানটি হলো আত্মীয় ও এনজিও-সহকর্মীদের নিয়ে ‘পকেট সরকার’ গঠন করা। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও সিভিল প্রশাসনকে নিজের পকেটে পুরতে ড. ইউনূস প্রশাসনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্তরে নিজের আত্মীয়, দীর্ঘদিনের এনজিও-সহকর্মী এবং নিজ এলাকার বিশ্বস্ত লোকদের বসিয়েছেন। যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে রেখে এই ধরনের পক্ষপাতমূলক নিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো পর্দার আড়ালে একটি সুসংগঠিত সমান্তরাল ‘পকেট সরকার’ গড়ে তোলা।
গেজেট ও আদালতের নথিতে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের এত বড় মেগা সিন্ডিকেটের অকাট্য প্রমাণ থাকার পরেও বর্তমান সরকার এক রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। অপরাধের পাহাড় দেখার পরেও কেন এই ইউনূসের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আইনি ব্যবস্থা বা তদন্ত শুরু হচ্ছে না—তা নিয়ে দেশের সচেতন মহল ও সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষ ইনভেস্টিগেশন সেল এই মেগা দুর্নীতির প্রতিটি ফাইলের প্রশাসনিক নথির ভেতরের খবর প্রতিমুহূর্তে অনুসন্ধান করছে।
