নিজস্ব প্রতিনিধি : যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন কঠোর নির্দেশনার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের বিয়ে নিয়ে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিয়ে করে স্বামী বা স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার প্রচলিত প্রক্রিয়া আগের তুলনায় দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠায় অনেক পরিবার এখন তাদের পূর্ব পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অনেক পরিবার দেশে গিয়ে ধুমধাম করে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতেন এবং পরবর্তীতে স্পাউস ভিসার মাধ্যমে নবদম্পতিকে একত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ করে দিতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই চেনা পথ আর আগের মতো সহজ নেই। বর্তমানে স্পাউস ভিসা ও গ্রিনকার্ড-সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা পরিবারগুলোর মধ্যে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রবাসী পরিবারগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বিয়ের পর একজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং অপরজন বাংলাদেশে অবস্থান করতে বাধ্য হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। এতে নবদম্পতিদের দাম্পত্য সম্পর্কে তীব্র মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা এবং এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে থাকা স্বামী বা স্ত্রীকে দেখতে বারবার যাতায়াত করতে গিয়ে প্রবাসীদের কর্মজীবনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘ অপেক্ষা ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে দেশে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক অভিভাবক এখন বাধ্য হয়ে দেশ থেকে পাত্র-পাত্রী আনার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক খোঁজার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বা ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা তরুণ-তরুণীদের জন্য বাংলাদেশ থেকে আসা জীবনধারা, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এমনিতেই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক দায়িত্ব, গৃহস্থালি কাজ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকেও দাম্পত্য জীবনে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হতে পারে।
এদিকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশনサービスেস (ইউএসসিআইএস) সম্প্রতি স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন নীতিগত কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে কনস্যুলার প্রসেসিংয়ের মাধ্যমেই পুরো আবেদন সম্পন্ন করতে হতে পারে। কেবল বিশেষ বা ব্যতিক্রমধর্মী মানবিক পরিস্থিতি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা গেলেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ মিলবে।
নতুন এই কঠোর অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী ভিসাধারী এবং তাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়তি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আবেদন প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে সামান্য জটিলতা দেখা দিলে দীর্ঘ সময়ের জন্য দম্পতিদের একে অপরের থেকে আলাদা থাকতে হতে পারে।
অভিবাসন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ও পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। আবেদনকারীর পূর্বের অভিবাসন ইতিহাস, আইন মেনে চলার রেকর্ড, তথ্য গোপনের কোনো অভিযোগ কিংবা অন্য কোনো আইনি জটিলতা আছে কি না—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে মার্কিন প্রশাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা বৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে অতীতে স্ট্যাটাস লঙ্ঘন, ওভারস্টে বা অন্য কোনো অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে আবেদন অনুমোদনের পথ অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন নির্দেশনায় আরও পরিষ্কার করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে আবেদন জমা দিলেই গ্রিনকার্ড অনুমোদনের কোনো নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে কনস্যুলার সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হবে এবং ভিসা অনুমোদিত হলে তবেই পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ মিলবে। তবে আবেদন কোনো কারণে প্রত্যাখ্যাত হলে দীর্ঘ ও জটিল আপিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, নতুন নীতির প্রভাব ইতোমধ্যে অনেক প্রবাসী পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তাদের পরামর্শ, বিয়ে ও অভিবাসন-সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করা এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নি খায়রুল বাশার বলেন, বৈধভাবে বিবাহিত এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীরা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে পারেন, তবে প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে চুলচেরা মূল্যায়ন করা হবে। তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, অভিবাসন সুবিধা বা গ্রিনকার্ড পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভুয়া বা প্রতারণামূলক বিয়ের চেষ্টা গুরুতর ফেডারেল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর ফলে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, যেসব ক্ষেত্রে পারিবারিক, মানসিক বা মানবিক কারণে বিশেষ ধরনের কষ্টের বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব, সেখানে কিছু সুযোগ থাকতে পারে, তবে সেটি কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়। ফলে সন্তানদের বিয়ে নিয়ে প্রবাসী পরিবারগুলোর পরিকল্পনায় নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে এবং একসময়ের সহজ প্রক্রিয়াটি এখন দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
