ফোরটিন ডেস্ক : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত ১০ই মে রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রায় ৭৬ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় দলটি একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা, সামরিক শাসন ও চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পরিস্থিতি দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ও নজিরবিহীন।

১৯৪৯ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় হওয়ার ইতিহাসকে মূলত সাতটি প্রধান টাইমলাইনে ভাগ করা যায়:
১. আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও প্রথম নিষেধাজ্ঞা (১৯৫৮): ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর জেনারেল আইয়ুব খান ‘প্রোডো’ (PRODO) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ শীর্ষ নেতারা কারারুদ্ধ হন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের পর শেখ মুজিব ও তরুণ নেতাদের হাত ধরে ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে দলটি পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

২. ১৯৭১ সালে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা ও পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে কালরাত শুরুর পরদিন ২৬শে মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে “রাষ্ট্রদ্রোহী” ঘোষণা করে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে মুজিবনগর সরকার গঠনের মাধ্যমে দলটির নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
৩. ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন ও কারারুদ্ধ নেতৃত্ব: ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩রা নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে আওয়ামী লীগ। সামরিক ও পরবর্তী সরকারগুলোর কঠোর নজরদারিতে দলটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। পরে ১৯৭৬ সালে পলিটিক্যাল পার্টিজ রেগুলেশনের (পিপিআর) অধীনে দলটি নিবন্ধন পায় এবং ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা দলের দায়িত্ব নিলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পায়।

৪. এরশাদের সামরিক শাসনামল (১৯৮২–১৯৯০): জেনারেল এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি দল নিষিদ্ধ না হলেও জনসভা ও মিছিলের ওপর কড়া বিধিনিষেধ ছিল। শেখ হাসিনাকে একাধিকবার গৃহবন্দি করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং পরবর্তীতে ৯০-এর গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ রাজপথে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

৫. ২০০১-২০০৬: জোট সরকারের সময়ে নিপীড়ন: ২০০১ সালের নির্বাচনের পর চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর ব্যাপক রাজনৈতিক হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ২৪ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়েও দলটি নিজেদের সংগঠিত রাখে।
৬. ২০০৭-২০০৮: সেনা সমর্থিত সরকারের ‘মাইনাস টু’ নীতি: সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে “মাইনাস টু” ফর্মুলার অধীনে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে রাজনীতিতে কড়াকড়ি থাকলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দলটি পুনরায় ক্ষমতায় ফেরে।
৭. ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ও সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা: অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা ১৫ বছরের শাসনামলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ‘গণহত্যা’র মারাত্মক অভিযোগে অভিযুক্ত দলটি।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের বিদেশে পলায়ন এবং শীর্ষপর্যায়ের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে, গত ১০ই মে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদ বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাইবার স্পেসসহ আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, অতীতে দলটিকে রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে কোণঠাসা করা হলেও এবার তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের আইনি ও নৈতিক দণ্ড রয়েছে, যা কাটিয়ে উঠে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
