লেখকঃ নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শহীদুল জহির রাজাকারের মাথায় টুপি দিয়েছেন বলে সলিমুল্লাহ খান গোস্বা করেছের। কিন্তু কেন? সাহিত্য তো পুলিশ রিপোর্ট নয় যে সেখানে লেখক তার কল্পনাশক্তি ব্যবহার করতে পারবেন না। সাহিত্যে অলঙ্কার থাকে, মেটাফোর থাকে, প্রতীক থাকে, অস্পষ্টতা থাকে, রহস্যও থাকে। ফিকশনকে যদি কেউ নন-ফিকশন রিপোর্টের মানদণ্ডে বিচার করেন, তাহলে তাঁর সাহিত্যবোধ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
গল্প দুই ধরনের হতে পারে—ফিকশন এবং নন-ফিকশন। আবার নন-ফিকশনের মধ্যেও রিপোর্ট, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, ন্যারেটিভ—এসবের আলাদা আলাদা প্রকৃতি আছে। যে ব্যক্তি ফিকশন, নন-ফিকশন, রিপোর্ট এবং সাহিত্যিক বয়ানের পার্থক্য বোঝেন না, তিনি সাহিত্যের মান নিয়ে বক্তৃতা করতে গেলে সমস্যা তৈরি হবেই।
শহীদুল জহির মুক্তিযুদ্ধের কোনো সরকারি রিপোর্ট লেখেননি। তিনি সাহিত্য লিখেছেন। একজন কথাসাহিত্যিক চরিত্র নির্মাণে প্রতীক ব্যবহার করতেই পারেন। রাজাকার চরিত্রের মাথায় টুপি দেওয়া যদি কারও কাছে সমস্যা মনে হয়, তাহলে তাঁকে দেখাতে হবে—এতে গল্পের ভাষা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে, চরিত্র নির্মাণ কোথায় দুর্বল হয়েছে, আখ্যানের গঠন কোথায় ভেঙে পড়েছে, প্রতীকের ব্যবহার কোথায় অকার্যকর হয়েছে। শুধু “টুপি দিয়েছে, তাই ফলস”—এটা সাহিত্যসমালোচনা নয়; এটা ব্যক্তিগত বিরক্তি।
সলিমুল্লাহ খান যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবিত ছিলেন বলে দাবি করেন, তাঁর নিজের অবস্থান বা অভিজ্ঞতা কী ছিল, সেটিও জানতে পারলে ভালো হতো। কারণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দাবি যদি সাহিত্য বিচার করার নৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।
বক্তৃতা দিতে গিয়ে অন্যকে “তৃতীয় শ্রেণি” বলে উড়িয়ে দেওয়া সলিমুল্লাহ খানের পুরনো স্বভাব। তিনি নিজে দর্শনের অধ্যাপক নন, তবু দর্শন বিষয়ক একাডেমিক কনফারেন্সে আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ সম্পর্কে একটি বাক্যও না বলে বাংলাদেশের দর্শনচর্চাকে “তৃতীয় শ্রেণির দর্শনচর্চা” বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলায় কেন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হচ্ছে না—এসব নিয়ে বিষোদ্গার করেছেন। এটা একাডেমিক আলোচনা নয়; এটা বুদ্ধিবৃত্তিক মাস্তানি।
যদি প্রবন্ধটি তাঁর নিজের এক্সপার্টিসের বাইরে হয়ে থাকে, তাতেও কোনো সমস্যা ছিল না। সেক্ষেত্রে তিনি আলোচক হতে অস্বীকৃতি জানাতে পারতেন। অথবা বিনয়ের সঙ্গে বলতে পারতেন, বিষয়টি তাঁর বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্র নয়। কিন্তু আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে আলোচ্য প্রবন্ধ বাদ দিয়ে গোটা দেশের দর্শনচর্চাকে হেয় করা কোনো সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নয়।
আমার এক সহকর্মী এবং ফেসবুক ফ্রেন্ড বলেছেন, “তিনি একই রকম ক্রিটিক চর্চা করতে চান। সম্ভবত আমাদের আপত্তি… এখানেই।” তিনি অন্যদের “তৃতীয় শ্রেণি” বলবেন, কিন্তু তাঁর নিজের বক্তব্যের সমালোচনা শুনতে চাইবেন না—এটা গ্রহণযোগ্য নয়। যিনি অন্যদের কঠোরভাবে বিচার করেন, তাঁকেও একই কঠোর মানদণ্ডে বিচার করার অধিকার অন্যদের আছে।
দর্শন নিয়ে কর্তৃত্বের ভঙ্গিতে কথা বলতে হলে দর্শনের প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব, যুক্তি, টেক্সট, গবেষণা ও পিয়ার রিভিউড কাজের ভিত্তিতে কথা বলতে হয়। একই কথা ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভাষা নিয়ে ব্যক্তিগত রুচি, শব্দবিদ্বেষ বা আবেগকে ভাষাতত্ত্ব হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায় না।
কিছুদিন আগে একটি ভিডিওতে দেখলাম তিনি বলছেন, বাংলা ভাষায় “চিন্তক” শব্দের ব্যবহার করা যাবে না। হাউ ফানি! ভাষায় নতুন শব্দ তৈরি হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা। যে কেউ শব্দ কয়েন করতে পারেন। সেই শব্দ টিকে থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে ভাষাভাষী মানুষের ব্যবহার। নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমে শব্দ কনভেনশন পায়, অর্থ পায়, এবং ভাষার অংশ হয়ে যায়।
“চিন্তক” শব্দটি বাংলায় যুক্ত হয়েছে, ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থ বহন করছে। সুতরাং এখানে কোনো ফ্যাসিবাদ নেই। বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে নিজের ব্যক্তিগত রুচির নামে আটকে দিতে চাওয়াটাই বেশি কর্তৃত্ববাদী।
বস্তুত, সমস্যা হলো—যিনি সব বিষয়ে পাণ্ডিত্য জাহির করতে চান, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য, তত্ত্ব ও বিশ্লেষণের সমন্বয়ে নিজের স্বকীয় অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন না, তিনি শেষ পর্যন্ত সবাইকে “তৃতীয় শ্রেণি” বলেই স্বস্তি পান।
সুতরাং, উদ্দেশ্য যেখানে স্পটলাইট, সেখানে সমালোচনা কম, শ্রেণিবিভাগ বেশি। আর এক্ষেত্রে পাণ্ডিত্যের সহজ সূত্র হলো: কন্টেন্ট না বুঝলে বলুন “তৃতীয় শ্রেণি”।
